শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা : সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রজনন মৌসুমে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বনবিভাগ। এ সময় ভ্রমণ, মাছ ও কাঁকড়া শিকার, মধু আহরণসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকবে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, ২৬ মে থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র (পাস) প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। যারা পূর্বে পাস নিয়ে এখনো বনে রয়েছেন, তাদের ৩১ মে’র মধ্যে ফিরতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রতি বছর জুন-আগস্ট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় যাতে বনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, ইঞ্জিন চালিত বোট চালক ও ট্যুর অপারেটররা। তারা বলছেন, সরকার যে পরিমাণ সহায়তা দেয়, তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
শ্যামনগরের দাঁতিনাখালী গ্রামের এক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই সময় কাঁকড়া ডিমও দেয় না, বাচ্চাও ফোটে না। তখন কেন নিষেধাজ্ঞা থাকবে? বরং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এমন নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “এই তিন মাস চলার মতো সঞ্চয় নেই, আমাদের দিনে আনা দিনে খাওয়া। সমিতি থেকে সুদে টাকা নিতে হয়।”
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৩ হাজার ৯২৮ জন। অথচ সরকারিভাবে চাল সহায়তা পাবে মাত্র ৮ হাজার ৩২৪ জন। তাদের ৩ মাসে দুই ধাপে ৭৭ কেজি চাল প্রদান করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, প্রকৃত জেলের পরিবর্তে সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন অনেকে যারা সুন্দরবনে যান না। অনেকে একাধিক বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) তৈরি করে ভাড়া দিয়ে চলেন। ফলে প্রকৃত বনজীবীরা থেকে যান বঞ্চিত।
গতকাল শনিবার (৩১ মে) সকালে খোলপেটুয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক মাছধরা নৌকা সুন্দরবন থেকে ফিরেছে। জেলেরা জাল ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ কেউ নৌকা মেরামত করছেন। অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কীভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই নিষেধাজ্ঞা পুরো সুন্দরবনের ওপর থাকলেও কিছু প্রভাবশালী গোপনে বনের গভীরে প্রবেশ করে মাছ শিকার করে থাকেন। এ সময় সাধারণ জেলেরা বঞ্চিত থাকলেও, তারা হয়তো লাভবান হন। এতে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য বিঘিœত হয়।
বনবিভাগের দাবি, এই তিন মাস নিষেধাজ্ঞার ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং বন নিজের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। তবে এই সময়ের জন্য কার্যকর ও ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত না হলে বনজীবীদের জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।