আহসানুল হক জুয়েল, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা:
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে কিশোরগঞ্জের বাস কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফলে ঢাকা-কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ রুটে চলাচলকারী গাজীপুরের কাপাসিয়া, কিশোরগঞ্জ জেলা সদর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদি, হেসেনপুর, নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলাসহ আশপাশের লাখ লাখ মানুষ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অপরদিকে কিশোরগঞ্জ ভায়া ভৈরব বাজার ভেলানগর ভুলতা মাধবদী, কাচপুর শেখেরচর, নারায়নপুর, ইটাখলা,বাজিতপুর, কুরিয়ারচর রুটের যাত্রীরাও অতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায়ের ফলে বাস মালিকদের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় যাত্রীবাহী পরিবহনগুলো ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে।
এবছর পবিত্র ঈদুল আযহায় রাজধানী ঢাকা থেকে যাত্রী সাধারণ ঈদ উদযাপনের জন্য দেশের বাড়ি যাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হয়েছে আবার ঈদুল আযহার দশ দিন ছুটির পর রাজধানী ঢাকায় ফিরতে যাত্রী সাধারণ কে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে সকল বাসগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেছে সেই সকল বাস মালিকরা যাত্রীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে পারেনি। কোন কোন বাস অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ এর কারণে যাত্রীদেরকে অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দিতে হয়েছে।

সবগুলো পরিবহন কোম্পানি যাত্রীদের কাছ থেকে গেটলক সার্ভিসের ভাড়া আদায় করলেও বাসগুলোতে সেবা মিলে লোকাল সার্ভিসের। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে যাত্রীদেরকে অনেক সময় মারধরের শিকার হতে হয়। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা রুটে চলাচলকারী সবগুলো বাসই হলো স্থানীয় প্রভাবশালীদের। বাংলাদেশের স্বনামধন্য বাস কোম্পানিগুলো কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা ভায়া কাপাসিয়া, ভায়া ভৈরব বাজার হয়ে ঢাকা চলাচলের চেষ্টা করলেও কিশোরগঞ্জ বাস মালিক সমিতি কোনভাবেই অনুমতি দিতে চায় না। ফলে দেশের সুনামধন্য কোম্পানির বাসগুলো উক্ত রুটে চলাচল করতে পারছে না। এই প্রতিনিধিকে যাত্রীরা জানান উন্নতমানের বাস চলাচল করলে আমরা ভাড়া বেশি দিতেও আপত্তি নেই। কিন্তু এই সকল লক্ষর জক্কর মার্কা লোকাল বাস গুলি দিয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে বাধ্য হচ্ছি চলাচল করতে। কিশোরগঞ্জ বাস মালিক সমিতি কিশোরগঞ্জ জেলা বাসীকে একপ্রকার জিম্মি করেই রেখেছেন বলে মনে করেন অনেক যাত্রী। বিগত দিনগুলোতে দেশের কয়েকটি বাস কোম্পানি কিশোরগঞ্জ ঢাকা রুটে বাস চলাচলের চেষ্টা করলেও কিশোরগঞ্জ মালিক সমিতির অসহযোগিতার কারণে উক্ত কোম্পানিগুলো বাস চালাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিশোরগঞ্জ বাস মালিক সমিতি ওই সকল নামিদামি বাস কোম্পানিগুলোকে অনুমতি প্রদান করতে নারাজ।
কোন কোন যাত্রী মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ বাস মালিক মালিক সমিতি এতটাই শক্তিশালী যে অন্য কোন বাস মালিক কোম্পানি তাদের সাথে পারছেন না। যখন যেই সরকার ক্ষমতাসীন হয় সেই সরকারের ছত্রছায়ায় চলে যায় এই কিশোরগঞ্জ বাস মালিক সমিতি। ফলে তাদের চরিত্রের কোন পরিবর্তন নেই। কথাই বলে সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ। বাস মালিক সমিতির একটি সূত্র দাবি করেছে গত কয়েক মাসে কিশোরগঞ্জ ঢাকা রুটে তাদের সমিতি বেশ কিছু নতুন বাস চালু করেছেন।
এদিকে জানা গেছে শেরপুর ঢাকা রুটে, হালুয়াঘাট ঢাকা রুটে, নেত্রকোনা ঢাকা রুটে, ময়মনসিংহ ঢাকা রুটে ,ময়মনসিংহ সিলেট রুটে ময়মনসিংহ চট্টগ্রাম রুটে, টাঙ্গাইল ঢাকা রুটে, কিশোরগঞ্জ ঢাকা রুটের তুলনায় ওই সকল রুটে ভাড়া অনেক কম। কিশোরগঞ্জ ঢাকা রুটে বাস ভাড়া সরকার নির্ধারিত বাস বাড়ার চাইতে কেন বেশি এটা বাসে চলাচলকারী যাত্রীদের বোধগম্য নয়। স্থানীয় বিআরটিএ প্রশাসন অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেছেন কিনা যাত্রীরা বলতে পারেন না।
স্থানীয়রা আরো জানান, এক সময় ‘ঢাকা পরিবহন’, ‘প্রভাতী বনশ্রী পরিবহন’ ও ‘ভাওয়াল পরিবহনে’র প্রায় শতাধিক বাস কাপাসিয়া সদর থেকে ঢাকা গেলেও বর্তমানে কাপাসিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজধানী কিংবা গাজীপুর সদরের উদ্দেশ্যে কোনো বাসই যাত্রা করে না। ফলে যাত্রার শুরুতে সিট মিলে না এখানকার অধিকাংশ যাত্রীর। এমনকি লোকাল সার্ভিসের মতো সেবাদাতা ২টি পরিবহনের বাস ছাড়া অন্যান্য বাসগুলোকে কাপাসিয়া সদরে এবং আশপাশের অধিকাংশ স্টপেজে যাত্রী উঠানামা করতে দেওয়া হয় না। ফলে ওই নির্দিষ্ট পরিবহনের বাসে যাত্রীরা তাদের ব্যাগ ও ছোট খাট জিনিস নিয়ে উঠতে গিয়ে মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন।
পরিবহন সূত্রে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে কাপাসিয়া হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় জলসিড়ি এক্সপ্রেসের ৬৪টি, অনন্যা পরিবহনের ৪৭টি, উজানভাটি পরিবহনের ২৬টি এবং অনন্যা ক্লাসিকের ৫৪টি যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। পাশাপাশি মহাখালী বাসটার্মিনালের উত্তর পাশের একটি পেট্রোল পাম্প এলাকা থেকে কাপাসিয়া হয়ে নরসিংদী জেলার মনোহরদীর চালাকচর পর্যন্ত ‘সম্রাট পরিবহনে’র ৪৫টি এবং সম্রাট ট্রান্সলাইনের ১৯টি যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। তাছাড়া গাজীপুর সদর থেকে কাপাসিয়ার সর্ব উত্তরের জনবহুল স্থান টোক বাজার পর্যন্ত ‘পথের সাথী রাজদূত’ পরিবহনের প্রায় ৪০টির মতো যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে থাকে।
কাপাসিয়া সদরের আব্দুর রহমান নামের এক যাত্রী জানান, গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে কাপাসিয়ার দূরত্ব মাত্র ২৯ কিলোমিটার। সেখান থেকে ‘অনন্যা পরিবহন’, ‘অনন্যা ক্লাসিক’ ও ‘জলসিড়ি এক্সপ্রেসের’ বাসে কাপাসিয়া আসতে যাত্রীদেরকে ২০০ টাকা দিয়ে একটি টিকিট কিনতে হয়। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে কাউন্টার থেকে বলা হয়, যেহেতু কাপাসিয়ায় তাদের স্টপেজ নেই; তাই টোক বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত টিকিট কিনে কাপাসিয়া যেতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নানা কটু কথা শুনতে হয় এবং হেনস্তার শিকার হতে হয়।

উপজেলার টোক ইউনিয়নের বীর উজুলী এলাকার ফরহাদ হোসেন জানান, বীর উজুলি থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার দূরত্ব ৪৪ কিলোমিটার এবং অনন্যা ক্লাসিক পরিবহনের টিকিটের গায়ে ১৫০ টাকা লেখা থাকলেও এখানে ভাড়া আদায় করা হয় ১৯০ টাকা।
টোক এলাকার ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ জানান, টোক থেকে কাপাসিয়ার দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার হলেও পথের ‘সাথী রাজদূত’ পরিবহনে ভাড়া আদায় করা হয় ৫০ টাকা এবং গাজীপুরের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার হলেও ভাড়া আদায় করা হয় ১৫০ টাকা। অন্যান্য পরিবহনগুলোতে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টোক পর্যন্ত ভাড়া গুণতে হয় ১৭০ টাকা থেকে ২শ’ টাকা পর্যন্ত। খিরাটি এলাকার মো.মকবুল হোসেন জানান, ঢাকা-কাপাসিয়া-মনোহরদী-চালাকচর সড়কে ‘সম্রাট পরিবহন’ ও ‘সম্রাট ট্রান্সলাইন’ একমাত্র যাত্রীবাহী পরিবহন হওয়ায় যাত্রীরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কাপাসিয়া থেকে সালদৈ চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার দূরত্বে যেতে তাদেরকে ভাড়া দিতে হয় ৫০ টাকা।
আজিজুল হক নামে নামে কিশোরগঞ্জ এলাকার একজন যাত্রী জানান, ঢাকা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে কিশোরগঞ্জের দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার হলেও অনন্যা পরিবহনে অনন্যা ক্লাসিক পরিবহনে তাদেরকে ভাড়া দিতে হয় ৩৩০ টাকা। ঢাকা-কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ সড়কে ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি জানান। এদিকে কিশোরগঞ্জ তায়া ভৈরব বাজার হয়ে ঢাকা যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ১৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব হলেও অনন্যা সুপার, অনন্যা পরিবহন লিমিটেড, যাতায়াত সুপার, যাতায়াত পরিবহন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অনেক বেশি ভাড়া নিয়ে থাকেন। এই ধরনের অভিযোগ অনেক যাত্রীর। প্রতিবাদ করে কোন লাভ হয় না। যাত্রী অধিকার পরিষদ নামে একটি সংগঠন কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসককে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদে স্মারকলিপি দিলেও কোন প্রকার কার্যকারিতা নেই।
জানা গেছে জ্বালানি তেলের দাম উঠানামার পর সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে প্রতিকিলোমিটার ২ টাকা ১২ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। ভাড়ার এই নতুন হার ডিজেলচালিত বাসের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং সিএনজিচালিত বাসে ভাড়া এক পয়সাও বাড়ানো যাবে না বলে সতর্ক করা হয়। কিন্তু -কিশোরগঞ্জ কাপাসিয়া ঢাকা ও মনোহরদী কাপাসিয়া ঢাকা সড়কে চলাচলরত সাতটি কোম্পানির বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়ে থাকে। বাস টিকিটের গায়ে আবারো নতুন করে সিল মেরে গড়ে সাড়ে তিন টাকা থেকে পাঁচ টাকা কিলোমিটার হারে ভাড়া আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বাস কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে নিজেদের মতো করে একটি ভাড়ার তালিকা করে বাসে রেখে দেন। সাধারণ যাত্রীরা তালিকা দেখতে চাইলে তা দেখিয়ে অনেকটা জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। কোন কোন কোম্পানির বেশির ভাগ বাস সিএনজিচালিত হলেও তারা তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি ভাড়া আদায় করলেও তেলের দাম কমার পর সরকার ভাড়া কমালেও বাস মালিক সমিতি গুলো ভাড়া কমায়নি। পরিবহন কোম্পানির মালিকরা সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী হওয়ায় এ পথের যাত্রীরা ভাড়া নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন নেতা দাবি করেন, এ সড়কে অতিরিক্ত বাসের কারণে ভয়াবহ যানজট হয়। এ কারণে বর্তমানে তাদের বাসগুলো পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছেন না এবং যাতায়াতে সময় বেশি লাগায় ট্রিপ কমে গেছে। এইজন্য তারা ভাড়া কমাতে পারছেন না।
এ বিষয়ে গাজীপুর,কিশোরগঞ্জ বিআরটিএ’র কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানান জানান, কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায় করা যাবে না, যদি কোন বাস কোম্পানি আদায় করে থাকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই প্রতিবেদককে কিশোরগঞ্জ ঢাকা রুটে চলাচলকারী বেশ কিছু সাধারণ যাত্রী জানান কবে নাগাদ কিশোরগঞ্জ ঢাকা বাস রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ হবে তা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জানতে চান। এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে সচেতন যাত্রী মহল মনে করেন।