মোংলা সংবাদদাতা : ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’Ñ প্রবাদটির বাস্তব রূপ যেন দেখা যাচ্ছে খুলনার মোংলা উপজেলার বুড়িরডাঙ্গা গ্রামে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকার পুকুর ও মৎস্যঘেরগুলোতে দেখা মিলছে এক বিশালাকৃতির কুমিরের। হঠাৎ পানির ওপর ভেসে ওঠা কিংবা পাড়ে উঠে বিশ্রাম নেওয়া এই কুমিরটি এখন গ্রামজুড়ে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।

অক্টোবরের প্রথম দিকে স্থানীয় বাসিন্দা অনিন্দ ম-লের মৎস্যঘেরে প্রথম এই কুমিরটি দেখা যায়। এরপর এক সপ্তাহ ধরে লাঠি-শোঁটা ও আওয়াজ দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও ১২ অক্টোবর কুমিরটি আবার দেখা দেয় পার্শ্ববর্তী জোয়ারদার বাড়ির বড় পুকুরে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কুমিরটিকে মাঝে মধ্যে পুকুরের পাড়ে উঠে রোদ পোহাতেও দেখা গেছে।

গ্রামটির আশপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি জলাশয়, যা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। এসব জলাশয় থেকে প্রায় এক হাজারের বেশি পরিবারের মানুষ দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহার করেন। ফলে গ্রামজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র আতঙ্ক। অনেকে পুকুরের ধারে যেতে কিংবা মাছ ধরতে সাহস পাচ্ছেন না।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘আমাদের বড় পুকুরে প্রথম কুমিরটা দেখা যায়। আমার ভাইপো, ছোট ভাই সুবর্ণ জোয়ারদার ও আরও দুজন স্পষ্টভাবে দেখেছে। আমরা কাছে যেতেই কুমিরটা লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে যায়। এখন প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে দেখে যাচ্ছে, কিন্তু ভয় কাটছে না কারও।’

এক নারী বলেন, ‘আমরা তো এই পুকুরের পানি ব্যবহার করিÑ গোসল, রান্না, খাওয়াসহ সব কাজেই। এখন কুমিরের ভয়ে কেউ আর কাছে যেতে পারছে না। বাচ্চারা তো আরও ভয়ে আছে।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগে একাধিকবার খবর দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এক কিশোর জানায়, ‘আমি দুই দিন ধরে দেখতেছি কুমিরটা অনেক বড়—আমার থেকেও অনেক মোটা।’ পাশের এক গৃহবধূ বলেন, রাতে ঘুম আসে না। ভয় হয় কখন না জানি ঘরে ঢুকে পড়ে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, আশেপাশে ইপিজেড ও বাইরের এলাকার মানুষও থাকেন, যারা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন না। কেউ যদি অসাবধানতাবশত পানিতে নামে, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবন করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, ‘এটি ওয়াইল্ডলাইফ টিমের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা সরঞ্জামের অভাবে নিজেরা রেসকিউ করতে পারছি না। তবে ছোট জলাশয়ে অবস্থান করলে আমরা ধরার চেষ্টা করতাম।’ অন্যদিকে, খুলনা ওয়াইল্ড টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তন্ময় আশ্চর্য বলেন, ‘বিষয়টি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের আওতাধীন। তারা ভালোভাবে জানে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের করমজল নদীতে কুমিরের আক্রমণে জেলে সুব্রত ম-ল নিহত হন। সেই ঘটনার পর থেকেই বুড়িরডাঙ্গা গ্রামে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কুমিরটি ধরার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে মানুষের জীবন ও জলাশয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।