শাহিনুর রহমান সুজন, চারঘাট (রাজশাহী): রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভার বহু প্রতীক্ষিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের সময় অতিক্রান্ত হয়েছে সাত বছর। কিন্তু আজো এক ফোঁটা পানি পৌঁছেনি পৌরবাসীর দোরগোড়ায়। প্রকল্প চালুর আগেই পাইপ ফেটে গেছে, মেশিন অচল। অনিয়ম, দুর্নীতি আর তদারকির অভাবে পুরো প্রকল্পটি আজ ব্যর্থতার প্রতীক।

চারঘাট পৌর এলাকা ঘিরে থাকা পদ্মা ও বড়াল নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে এক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, ভ্যানগাড়িতে ড্রামভর্তি পানি পৌঁছে দেয়া হয় ঘরে ঘরে। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ২২ নবেম্বর। কিন্তু চারবার সময় বাড়িয়েও আজো তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-এর অর্থায়নে পরিচালিত তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এটি বাস্তবায়িত হয়।

ভয়াবহ অনিয়ম : অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম। প্রকল্পের পাঁচটি পাম্প হাউজে ২৫ হর্সপাওয়ারের মেশিন স্থাপনের কথা থাকলেও বসানো হয়েছে মাত্র ১৫ হর্সপাওয়ারের মেশিন। পাইপের পুরুত্ব নির্ধারিত ছিল ৫ মি.মি., বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ২.৭ মি.মি. পুরুত্বের নি¤œমানের পাইপ। পাইপ মাটির চার ফুট গভীরে বালির স্তরে বসানোর কথা থাকলেও, বসানো হয়েছে মাত্র দুই ফুট নিচে, কোনো সুরক্ষা ছাড়াই। এবছর ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার পর মাত্র পাঁচ মিনিটেই পাইপ ফেটে যায় এবং পাম্প মেশিন বিকল হয়ে পড়ে। চারঘাট পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মজিবর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “প্রকল্পে ন্যূনতম কারিগরি মানও মানা হয়নি। প্রকল্প চলাকালে আমাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে দেয়া হতো না। বুঝে পাওয়ার পর দেখি সব অনিয়ম।”

সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁচটি পাম্প হাউজ এবং ওভারহেড পানির ট্যাংক আজো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। মরিচায় জর্জরিত তালা, ছাউনির ভেতরে জমেছে মাকড়সার জাল ও আগাছা। কোটি টাকার সরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কাঁকড়ামারী এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, “পাঁচ বছর আগে পাম্প হাউজ তৈরি হয়, কিন্তু তালা আর খোলা হয়নি।

সাত বছর ধরে পানি আসার অপেক্ষায় আছি, এখন শুনি সবকিছুই অকেজো।” প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “কাগজে-কলমে প্রকল্প প্রধান ছিলাম, বাস্তবে কাজ করতে দেয়া হয়নি। আমি সম্প্রতি অবসরে গিয়েছি। এখন প্রকল্প চালু না হওয়ার বিষয়ে জানি না।” প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে মেসার্স মুক্তা কনস্ট্রাকশন। স্থানীয়ভাবে এই প্রকল্পের কাজের দায়িত্বে ছিলেন যুবলীগ নেতা শাহিনুর রহমান পিন্টু। বর্তমানে তিনি পলাতক, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। চারঘাট পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, সব সরঞ্জাম ব্যবহারের আগেই অকেজো হয়ে গেছে। কোনোভাবেই প্রকল্পের পানি সরবরাহ সম্ভব নয়। বিষয়টি স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।