চান্দিনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন খুবই জমজমাট চান্দিনা বাজার। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই এলাকাটি। বাজারটির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ক্ষীরদ খাল । খালের পাশে বহুতল ভবনে ভরা ধানসিঁড়ি আবাসিক এলাকা। এই এলাকাটি অনেকের কাছেই বসবাসের জন্য নিরাপদ ও পছন্দের। এখানে যেমন সাধারণ মানুষরা থাকেন তেমনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিরাও বসবাস করেন। প্রতিনিয়ত এই খালটিকে তারা দেখলেও এটি পরিস্কার করার কোনো উদ্যোগ নেননি। পলিথিন আর ময়লা আবর্জনার কারণে বাজারের উত্তরপাশের অংশটি যে খাল সেটি চেনাই যায় না। পশ্চিমপাশের অংশটিও দখলে চলে গেছে। মহাসড়ক থেকে বাজারে যাওয়ার জন্য খালের উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে কয়েকটি প্রবেশ পথ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলা পরিষদের উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ময়লা আবর্জনায় ভরা। যার কারণে সামান্য বৃষ্টিতে বাজারের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কারণ, ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিপূর্ণ থাকায় পানি সরতে পারছে না। খালে পানি থাকে, সঙ্গে থাকে প্রবাহ। তবে এ খালে এর কোনোটাই নেই। সামনে গিয়ে ময়লার ভাগাড় ভেদ করে সামান্য কালো তরল পদার্থ দেখা গেলেও তাকে পানি বলা মুশকিল।একই সাথে খাল থেকেই মশার জন্ম হচ্ছে। খাল উদ্ধার ও পরিষ্কার রাখতে সাবেক পৌর মেয়র ও বর্তমান পৌর প্রশাসকের কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ওই খাল দখল করে মার্কেট ও হোটেল নির্মাণ হয়েছে। পানি প্রবাহের কোন পথ নেই।যার দরুন পাশেই অবস্থিত আল-আমিন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরতে হয় চরম ভোগান্তিতে।একটু বৃষ্টি হলেই মাদ্রাসা মাঠ পানিতে ডুবে যায়। খাল দখল ও ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানায়,খালটির দেড় কিলোমিটার অংশ পৌরসভা,জেলা পরিষদ,সওজ ও পার্শ্ববর্তী দেবিদ্বার উপজেলাভুক্ত।এই জটিল সমীকরণে কোন পক্ষ এগিয়ে আসছে না।উপরন্তু খালটি দখল, দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পরেছে।এই খালই এখন চান্দিনা পৌরসভার বাসিন্দাদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।পাশাপাশি এ শহরের বিশাল জনগোষ্ঠীর আবর্জনার ভার বয়ে বেড়ানো অনেক খাল ধুঁকে ধুঁকে অনেকটাই নি.শেষ হয়ে গেছে। আর এ নিষ্ঠুর পরিণতি পোহাতে হচ্ছে শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের।
চান্দিনা পৌরসভার আরেকটি খাল হচ্ছে চান্দিনা-ছায়কোট খাল। এই খালটিও আবর্জনায় ভরা। যার কারণে সামাণ্য বৃষ্টিতেও পানি সরে না। একটু বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল আর ফলের পরিত্যক্ত ঝুড়িতে ভরপুর এই খাল। সঙ্গে গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তূপ। দূর থেকে দেখলে একে খাল ভাবা মুশকিল।ফলে পানি নিষ্কাশনের এ খালটি অনেকের কাছে মশা উৎপাদনের ‘কারখানা’ হিসেবে পরিচিত। মশার উৎপাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।
বিশিষ্টজনদের মতে, খালগুলো উন্মুক্ত করা না গেলে আর সেগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি না সড়লে এ চান্দিনা পৌরশহর বসবাস অনুপযোগী হতে বেশি দিন লাগবে না। এ শহর এখন এখানকার নাগরিকদের দু.স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।শুধু স্থায়ী পানিবদ্ধতা নয় যানজট, পরিবেশ বিপর্যয়, শব্দদূষণসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত এ শহরের বাসিন্দারা।
এদিকে পৌর শহরের বাইরের খালগুলোর অবস্থা আরও ভয়ানক। মাধাইয়া পশ্চিম বাজার সংলগ্ন খালও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে।বাজার ও বাসাবাড়ির সকল বর্জ্য মহাসড়কের পাশে ও ব্রিজের নিচে ফেলা হয়।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,বাজারের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহাসড়ক সংলগ্ন উত্তর পাশে তিনটি খালের মোহনা রয়েছে। দক্ষিণ দিকে খালের মুখে বাজারের আবর্জনা ফেলার কারণে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া ওই স্থানে পশু-পাখি উচ্ছিষ্ট খাচ্ছে। দুর্গন্ধে মহাসড়কে যাতায়াত করা যাত্রীরা নাক চেপে ধরছে। পশ্চিমমুখী খালের মুখে পাশের মার্কেটগুলোর ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে বাঁধ সৃষ্টি হয়েছে। ককসিটসহ ইলেকট্রনিকস পণ্য ফেলে ভারী আস্তরণ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে খালের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চান্দিনা উপজেলার খাল খননের দায়িত্বভার বিএডিসি ও পানি উন্নয়ন বিভাগের। দীর্ঘদিন তাদের কোন কার্যক্রম না থাকায় খালগুলো কচুরিপানা ও ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। অনেক খালে পানি প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
দেখা যায়, দখলদাররা খালগুলোকে পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে। খালের ওপর ঘর তুলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। রুটির দোকান, চায়ের দোকান, জুতা ও ইলেট্রনিকসের দোকান, ফার্নিচারের দোকান, ব্যবসায়িক চেম্বার, মুদির দোকানসহ এমন কিছু নেই যা গড়ে তোলা হয়নি। মাঝেমাঝে অভিযানে এসব স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যে আবারো সেইসব স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়। অদূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে উপো করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও কিছু মানুষ ব্যক্তিগত মুনাফার চিন্তায় খালগুলো ভরাট করে চান্দিনার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (অ.দা.) মো. আশ্রাফুজ্জামান খান ও প্রকৌশলী মাহিউদ্দিন জানান, চান্দিনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড তালিকাভুক্ত কোন খাল নেই। তবে খালের খনন কাজ আমরা করি। পাশাপাশি বিএডিসি, এলজিইডি করে। গত বছর আমরা তিনটি খাল খনন করেছি। ৭/৮টি খালের চাহিদা পাঠিয়েছি, বাজেট পেলে কাজ করতে পারব। এছাড়াও চান্দিনা-দেবিদ্বার-দাউদকান্দি নিয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। ম্যাপ দেখে দখলকৃত খালগুলো উদ্ধার ও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া খালগুলো খননে কাজ করব।
বিএডিসি চান্দিনার উপসহকারি প্রকৌশলী (সেচ) নাঈম সৌরভ জানান, গত দুই বছর চান্দিনায় আমাদের কোন কাজ হয়নি। নতুন প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করতেছি। আর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে কাজের তালিকা নিচ্ছি, যেখানে খাল খননের প্রয়োজনীয়তা আছে আমরা পরিদর্শন করে কাজ চালাব।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ আলম চৌধুরী জানান, বহু বছর আগেই (চান্দিনা বাজারের উত্তর পাশের খাল) লিজ দিয়েছি। বাকী কিছু জানতে হলে কিশোর বাবুর কাছ থেকে রবিবার জানতে হবে।
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, মাধাইয়া বাজারের পশ্চিম পাশের খালটি আমি দেখেছি। আমি বিএডিসির খাল খনন প্রকল্পে এটি দিয়েছি। এছাড়া আমরা নিয়মিত ময়লা পরিষ্কার করতেছি। যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ খাল ময়লা দিয়ে ভরাট হয়ে যায় আমরা দ্রুত পরিষ্কার করব। আর চান্দিনা বাজারের পশ্চিম পাশের খালটি পুরোটা আমাদের না। কয়েকটি পক্ষ (পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সওজ, দেবিদ্বার অংশ) জড়িত। আমি সবাইকে বলেছি। এখন একটি সমন্বিত মিটিং হতে হবে।যার যতুকু অংশ আছে খনন করে দিবে।