মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা : বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বর্তমানে কার্যত নিজেই ‘রোগী’ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সের অভাব, পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন, এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে এ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষ সরকারি চিকিৎসার আশায় এ প্রতিষ্ঠানে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি ক্লিনিক বা ফার্মেসির শরণাপন্ন হতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের কারণে বেশিরভাগ রোগী যথাযথ সেবা পান না। ইনডোর বিভাগেও পর্যাপ্ত বেডের অভাবে ভোগান্তির শিকার হন ভর্তি হওয়া রোগীরা। চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও অধিকাংশই বছরের পর বছর অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা শেফালি বেগম নামের এক গৃহবধূ বলেন, ‘হাসপাতালে আসলেও ডাক্তার পাওয়া যায় না। অথচ ঠিক সামনেই অবস্থিত বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে একই ডাক্তারদের পাওয়া যায়। যদি এসব ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণে আনা যেত, তাহলে সরকারি হাসপাতালে রোগীরা অন্তত মানসম্মত চিকিৎসা পেতেন। অনেক সময় হাসপাতালে ডাক্তার পাওয়া গেলেও প্রেসক্রিপশনে দেওয়া ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়, যা গরিবদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।’
একজন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল গফুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডাক্তার এখানে থাকে না। বাইরে চিকিৎসা করানো আমাদের সাধ্যের বাইরে। হাসপাতালে এলেও শুধু ওষুধ কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়, অথচ ওষুধ মজুত থাকে না।’
হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘এ হাসপাতালে ৩১ জন চিকিৎসকের পদ রয়েছে, কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। তাদেরও কেউ কেউ প্রশিক্ষণ বা ছুটিতে থাকেন। ফলে অল্প কয়েকজনকে বহির্বিভাগ, ইনডোর, জরুরি বিভাগ ও টিকাদান কর্মসূচি একসঙ্গে সামলাতে হয়। এতে রোগীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না।’
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, হাসপাতালের ভবনের অবস্থাও ভয়াবহ। অনেক স্থানে দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, ছাদের ভেতর দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে, এবং নানা ধরনের আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে আছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগীদের ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে তুলছে।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিন বলেন, ‘ধহাসপাতাল ভবনটি এখন নিজেই রোগী হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণ না হলে যেকোনো সময় রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্তমানে হাসপাতালের সেবা ভালো হওয়ায় শুধু মোংলা নয়, আশপাশের মোড়েলগঞ্জ, রামপাল, শরণখোলা এবং খুলনার দাকোপ থেকেও রোগীরা এখানে আসেন। কিন্তু ৩১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে মাত্র ৬ জন কর্মরত থাকায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য। তবে দ্রুত এই হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র অনেকটাই বদলে যাবে।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বন্দরনগরী মোংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার এমন করুণ অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক, জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন, কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতির অভাবে তারা সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তাদের দাবি, দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে অচল যন্ত্রপাতি মেরামত করে চালু করা, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করা এবং হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা-সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।