কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা : গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ‘ঢেঁকি’ দিয়ে চালগুড়া করার প্রাচিন এই পদ্ধত্বি বিলুপ্ত প্রায়।
গ্রাম বাংলা ঐতিহ্য ঢেঁকি, আজ হারিয়ে যেতে বসেছে । অতীতে গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে ছিলো কাঠের তৈরি এ ঢেঁকি। আজ সারা গ্রাম খুঁজলে একটাও ঢেঁকি পাওয়া যায় না।
প্রায় ৭০ বছর বয়সী মোছাঃ জাহানারা বেগম বলেন, আমাদের সময় অনেক মহিলা ছিলো যারা এ বাড়ি ও বাড়ি ঢেঁকি দিয়ে ধান ভেনে ( চাউল তৈরী করে) সংসার চালাত, আজ সে সব মহিলারা বেকার। ঢেঁকিতে তৈরি চাল দিয়ে ভাত রান্না বা চালের গুড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করে খাওয়ার মজাটাই আলাদা। কয়েক বছর আগেও ঢেঁকির ধুমধাম শব্দ শুনলে মানুষে বুঝতে পারতো, ঐ বাড়িতে নতুন কুটুম বা জামাই এসেছে।
অতিথীদের জন্য তৈরি করা হতো রসের পায়েস, শিয়ে পিঠা, রসের পিঠা, পুলি পিঠা, দুধ খেজুর পিঠা, চিতল পিঠা, মেরা পিঠা,পাক্কন পিঠা,চিকন পিঠ,দুইবিরানী পিঠা সহ বিভিন্ন প্রকার পিঠা তৈরী করা হত। বিশেষ করে শীত কাল বা পৌষ মাসে জামাই, মেয়ে, ভাগ্নে ভাগ্নি এমনকি বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন শহর থেকে ছুটতো গ্রামে পিঠা খাওয়ার জন্য। বাড়িতে বাড়িতে বসতো পিঠা তৈরির উৎসব। এ সকল উৎসব আজ বিলুপ্তির পথে, তার কারণ ঢেঁকি।
সময়ের আবর্তনে আর আধুনিকতার বিষাক্ত ছোবলে ক্রমাগত হারাতে বসেছে আমাদের বহু গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কুলা-ঢালা, গাইল-ছিয়া থেকে শুরু করে লাল-সবুজ রঙের কাগজ দিয়ে ঘুড়ি উড়ানো কিংবা গরুর হাল, লাঙল, মই, জোয়াল সবই আজ ক্যালেন্ডারের ছবি ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এসব উপকরণ একসময়ে বাংলার প্রতিটি ঘরে থাকাটা ছিলো অপরিহার্য।
কৃষকের ঘরে গরুর হাল লাঙল, মই থাকাটা ছিলো স্বাভাবিক না থাকলে তাকে কৃষক ভাবা-ই যেত না। সে রকম একটি উপকরণ হলো ঢেঁকি যা ষাট বা সত্তরের দশকে গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরেই ছিল অপরিহার্য একটি উপাদান।
ঢেঁকি ছিল না এমন বাড়ি বা সংসার আছে এমনটা সে সময় কল্পনা-ই করা যেত না। কৃষক মাঠ থেকে ধান কেটে আনতো। সেই ধান মাড়িয়ে সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চাল বানানো হতো। তারপর সেই চালে রান্না হতো। তখন চাল ভাঙানোর কোন ধরনের মেশিন ছিল না। ঢেঁকি ছিল একমাত্র ভরসা। আলাদা একটি ঘরই থাকতো গৃহস্থের বাড়িতে যা ঢেঁকিঘর নামেই পরিচিত থাকতো। কালের বিবর্তনে তা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বলা যায় হারিয়ে গেছে। কি বন্ধুরা চোখ কপালে তুললে নাকি? এই ঢেঁকি শব্দের সাথে তোমাদের কি পরিচয় হয়েছিলো? বা আছে? হয়তো আছে, কোন একরাতে দাদুর সেই গল্প বা কিচ্ছা বলার বিষয় ছিলো ঢেঁকি। দাদুর সেই দুর্দান্ত বয়সের স্মৃতিচারণ ঢেঁকি বিষয়ক গল্প হয়তো আজ মনে পড়ছে। হয়তো কারো কল্পনাতেই ঢেঁকি নামক বস্তুর অস্তিত্ব বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। থাক বা না থাক, সে যায় আসে না।
সাধারণত ছয় বা সাত হাত লম্বা, ও এক হাত বা তার কিছু কম চওড়া একখন্ড গাছকে ঢেঁকি হিসাবে তৈরি করে তা ব্যবহার করা হয়। সেই গাছ খন্ডের এক হাত বা তার চেয়ে কিছু বেশি অংশে ছিদ্র করে বসানো হয় একটি কাঠের লম্বা টুকরা, যার নাম মোনাই বা চুরনি। মোনাইয়ের ঠিক মাথায় বসানো হয় লোহার একটি গোলাকার পাত, যার নাম হয় গুলো। ধান রাখার জন্য গোলাকার ভাবে মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হয় একটি গর্ত। যার নাম নোট। নোটের নিচের অংশে বসানো হয় এক টুকরা গাছের গোড়া, যাকে বলা হতো গইড়া। কেউ কেউ আবার কাঠের পরিবর্তে ব্যবহার করতো শিল বা পাথর। ঢেঁকির শেষ অংশে দেড় হাত বাদ দিয়ে আরো এক বা দুই খন্ড কাঠ বসানো হয় ঠিক খাড়া করে, যার নাম কাতলা। ঢেঁকিতে আড়াআড়ি ছিদ্র করে তার ভেতর ঢোকানো হয় একখন্ড কাঠ, যাকে বলা হতো গোঁজা বা আইসস্যাল। সেই গোঁজা বসানো হতো কাতলার ওপর। পেছনে মাটি উঁচু করে বানানো হয় একটি গোদা। সেই গোদার ওপর দাঁড়িয়ে ঢেঁকিতে পা দিয়ে চাপ দিলে ঢেঁকি ওপরে উঠে আবার ছেড়ে দিলে তা দ্রুত নিচে নামে। সাধারণত ২-৩ জন মহিলা এ ঢেঁকি নামক যন্ত্রে কাজ করেন। ১-২ জন ঢেঁকি উত্তোলনের জন্য গোদার ওপর দাঁড়িয়ে ঢেঁকিতে পা দিয়ে চাপ দিয়ে থাকেন এবং পা সরিয়ে নিয়ে তাকে আবার নিচে পড়তে দেন। অপর মহিলা বৃত্তাকার গর্ত থেকে চূর্ণীকৃত শস্য সরিয়ে নেন এবং তাতে নতুন শস্য সরবরাহ করেন। ঢেঁকিতে পাড় দেয়ার কাজ খুবই শ্রমসাপেক্ষ। কাজটিতে মহিলাগণ একে অপরের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু কোনো কোনো সময় একজন মহিলা সম্পূর্ণ কাজটি একাই করে থাকেন। পরিশ্রম লাঘব করার জন্য এ কাজে নিয়োজিত মহিলাগণ পান-সুপারি মুখে পুরে নিজেকে চাঙ্গা করে তুলেন আবার কখনো কখনো মনের অজান্তে সুর তুলেন নানা রকম গানে।