জুবায়ের হোসেন, নাটোর : অর্ধবঙ্গেশ্বরী খ্যাত নাটোরর রানী ভবানীর রাজবাড়ীটি নির্মিত হয়েছে ৩০০ বছর আগে। যুগের পর যুগ ধরে দখলদারিত্ব ও প্রশাসনের উদাসীনতা মনোভাব অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় অযত্নে জৌলুস হারাচ্ছে রাজবাড়ীটি। হারিয়ে যেতে বসেছে তার স্থাপত্যশৈলী ও সৌন্দর্য্য। সরকারী কর্মকর্তারাও রাজবাড়ির একাংশ দখল করে বসবাস করেন। এছাড়া এর অভ্যন্তরেই গড়ে তোলা হয়েছে ভূমি অফিস, সরকারী কর্মকর্তাদের কোয়ার্টার, দোকানপাট, পিকনিকের রান্না করার স্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। যেন ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টের মহোৎসব চলছে এখানে। যা দেখে বিস্মিত এলাকাবাসি ও দর্শনার্থীরা। ঐতিহাসিক স্থাপনায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের দাবী সবার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দায়িত্ব নিলেও তেমন কোনো বড় সংস্কারের মুখ দেখেনি এই নিদর্শনটি। ফলে সংস্কারের অভাবে দিনে দিনে নষ্ট হচ্ছে ভবনের অবকাঠামো ও স্থাপত্যশিল্প। রাজা রামজীবন প্রায় ১২০ একর জমির উপরে এটি ১৭০৬ থেকে ১৭১০খ্রিঃ নির্মাণ করেন। এরপর অনেক রাজা এ রাজবংশ শাসন করেছেন। এখন রাজারানী না থাকলেও রয়েছে, তাদের স্মৃতি বিজড়িত রাজবাড়ীটি।
ইতিহাস থেকে জানাযায়, অষ্টাদশ শতকের শুরুতে নাটোর রাজবংশের উৎপত্তি হয়। ১৭০৬ থেকে ১৭১০খ্রিঃ পরগণা বানগাছির জমিদার গণেশ রায় ও ভবানী চরণ চৌধুরী রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়ে চাকরিচ্যুত হন। দেওয়ান রঘুনন্দন জমিদারিটি তার ভাই রাম জীবনের নামে বন্দোবস্ত নেন। এভাবে নাটোর রাজবংশের পত্তন হয়। রাজা রাম জীবন চৌধুরী নাটোর রাজবংশের প্রথম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন ১৭০৬ সালে, মতান্তরে ১৭১০ সালে। ১৭৩৪ সালে তিনি মারা যান। ১৭৩০ সালে রাণী ভবানীর সাথে রাজা রাম জীবনের দত্তক পুত্র রামকান্তের বিয়ে হয়। রাজা রাম জীবনের মৃত্যুর পরে রামকান্ত নাটোরের রাজা হন। ১৭৪৮ সালে রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পরে নবাব আলীবর্দী খাঁ রাণী ভবানীর ওপর জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাণী ভবানীর রাজত্বকালে তার জমিদারি বর্তমান রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৮০২ সালে রানী ভবানীর মৃত্যুর পর তাঁর দত্তকপুত্র রামকৃষ্ণের দুই পুত্র বিশ্বনাথ ও শিবনাথের মধ্যে জমিদারি ভাগাভাগি হয়। বড় ছেলে বিশ্বনাথ পান বড় তরফ এবং ছোট ছেলে শিবনাথের পেয়ে যান ছোট তরফ। সেই থেকে তাদের উত্তরাধিকারীরা ছোট তরফ ও বড় তরফ নামে জমিদারি পরিচালনা করেন। ১৭০৬-১৭১০ সালে নাটোর রাজবাড়ি নির্মিত হয়েছিল। রাজবাড়ির মোট আয়তন ১২০ একর। বিশাল জমিদারির রাজধানী নিজ জন্মভূমিতে স্থাপনের নিমিত্তে রঘুনন্দন, রাম জীবন তৎকালীন ভাতঝাড়ার বিলকে নির্বাচন করেন। ভাতঝাড়ার বিল ছিল পুঠিয়া রাজা দর্পনারায়ণের সম্পত্তি। এজন্য রঘুনন্দন ও রামজীবন রাজা দর্পনারায়ণের নিকটে বিলটি রায়তী স্বত্বে পত্তনীর আবেদন করেন। নতুন রাজাকে রাজা দর্পনারায়ণ জমিটি ব্রহ্মোত্তোর দান করেন। রামজীবন বিলে দীঘি, পুকুর ও চৌকি খনন করে সমতল করেন এবং রাজবাড়ি স্থাপন করেন। এলাকাটির নামকরণ করেন নাট্যপুর। রাজবাড়িতে রয়েছে ছোট-বড় ৮টি ভবন আছে। ২টি গভীর পুকুর ও ৫টি ছোট পুকুর। রাজবাড়ীর নিরাপত্তার জন্য চারিদিকে ঘিরে আছে দুই স্তরের বেড়চৌকি। রাজবাড়িটি ২টি অংশে বিভক্ত ছোট তরফ ও বড় তরফ। ১৯৮৬ সাল থেকে রাজবাড়ির পুরো এলাকাটি রানী ভবানী কেন্দ্রীয় উদ্যান বা যুবপার্ক হিসেবে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। আর ১৯৮৯ সাল থেকে রাজবাড়ির ভবনগুলো তদারকি করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।