মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা : মোংলা সমুদ্র বন্দরের কন্টেইনার অপারেটিং সিস্টেম আধুনিকায়নের ফলে দেশের তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। একসময় যে বন্দরটি সীমিত পরিসরে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হতো, এখন সেটিই ধীরে ধীরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি-কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই সম্পন্ন হচ্ছে মোংলা বন্দর দিয়ে, যা বাণিজ্য খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিনির্ভর অপারেটিং সিস্টেম এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। বন্দরের কন্টেইনার অপারেশন এখন আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর হয়েছে। নতুন কন্টেইনার পরিচালনা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং দুটি বড় জেটি নির্মাণাধীন থাকায় বন্দরের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য ১.৫ লাখ টিইইউ থেকে ৪ লাখ টিইইউতে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মোংলার কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে।
এই আধুনিকায়নের ফলে কনটেইনার খালাসে সময় কমেছে, ডেলিভারি আরও দ্রুত হচ্ছে, এবং ডিজিটাল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে এসেছে স্মার্ট পরিবর্তন। ফলে ব্যবসায়ীরা এখন কম সময়ে, কম খরচে ও কম জটিলতায় রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন। গার্মেন্টস শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, মোংলা বন্দরের উন্নত অপারেশন তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেÑচট্টগ্রাম বন্দরের চাপ এড়িয়ে এখন অনেকেই রপ্তানির জন্য বিকল্প হিসেবে মোংলাকে বেছে নিচ্ছেন।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চল থেকে মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হয়েছে। কম দূরত্ব ও দ্রুত যাতায়াতের সুবিধায় রপ্তানিকারকদের সময় ও খরচ উভয়ই সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া নতুন রেল সংযোগ ও সড়কপথের উন্নতির কারণে এই বন্দরের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। বর্তমানে নিয়মিতভাবে কনটেইনার জাহাজ আগমন ঘটছে, এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অপারেটর এই রুটে যুক্ত হচ্ছে। ফলে মোংলা বন্দর এখন দেশের গার্মেন্টস রপ্তানির একটি শক্তিশালী বিকল্প গেটওয়ে হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের জন্য দ্রুত সেবা, ওয়ান-স্টপ সলিউশন ও সহায়তামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো ব্যবসায়িক আস্থা বৃদ্ধি করেছে এবং রাজস্ব আয়েও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এনেছে। ভবিষ্যতে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি পোশাক রপ্তানির “এক্সপ্রেস রুট” হিসেবে মোংলার ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশ পর্যন্ত এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হতে পারে।
তবে এই অগ্রগতি স্থায়ী রাখতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। বড় সমুদ্রগামী জাহাজের আগমন এখনও সীমিত; তাই চ্যানেলের গভীরতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত ড্রেজিং অপরিহার্য। পাশাপাশি কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি ও ওয়ারহাউজের ধারণক্ষমতা বাড়ানো দরকার, যাতে ক্রমবর্ধমান পণ্য প্রবাহ সহজে পরিচালনা করা যায়। বন্দরের সঙ্গে খুলনা ও অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক তুলনামূলকভাবে সরু হওয়ায়, রেল ও সড়ক যোগাযোগে আরও উন্নত লজিস্টিক সুবিধা তৈরি করাও সময়ের দাবি।
এছাড়া আমদানিকৃত গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত কার ইয়ার্ড ও নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য বিশেষায়িত জেটি গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও কম জটিল করতে ডিজিটাল অপারেশন, দ্রুত ডেলিভারির দিকেও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এখন শুধু একটি অবকাঠামোগত সাফল্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ হ্রাস, সময় ও খরচ সাশ্রয়, এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সংযোগ তৈরিÑসবকিছু মিলিয়ে মোংলা বন্দর ধীরে ধীরে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, মোংলা বন্দর ভবিষ্যতে দেশের গার্মেন্টস রপ্তানি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম শক্তিশালী প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।