খালিদ হাসান সিপাই, কুষ্টিয়া : মাছ মাংসের দাম ও চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কুষ্টিয়ায় গরু মোটাতাজাকরণ খামার গড়তে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়েছে। এ জেলার বড় বড় গরুর সুনাম রয়েছে চারিদিকে। জেলার ৯৮৫ টি গ্রামই এখন যেন একেকটি গো-খামারে পরিণত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের এমন কোন বাড়ী পাওয়া যাবে না যেখানে গরুর খামার নেই। ঈদের পূর্ব মুহূর্তে খামারীদের ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ার আশা নিয়ে খামারীরা দেশের বিভিন্ন হাটে বিক্রির পরিকল্পনা করছেন। বড় বড় অনেক গরু কুষ্টিয়ার খামারগুলো থেকে কেনা শুরু করেছেন দেশের বড় পশু ব্যবসায়ীরা।

ভারতের পশু আমদানী না হলে খামারীদের এ আশা সফল হতে পারে। এ জেলার উন্নত মানের পশু একদিকে যেমন দারিদ্র বিমোচনে বেকার সমস্যায় ভূমিকা পালন করছে। অপরদিকে মাংসের চাহিদা পূরণে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

কুরবানীর পশুরহাটে কুষ্টিয়ার গরুর বাড়তি চাহিদা রয়েছে। আর এ চাহিদার যোগান দিতে জেলায় এবছর ২ লক্ষধিক কুরবারীর পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক উপায়ে ও দেশীয় পদ্ধতিতে গরু লালন পালন এবং মোটাতাজা করেছে জেলার খামারীরা। লাভের আসায় শেষ মুহূর্তে পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। গরু পালন কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য। আর এ ঐতিহ্যের প্রসার ঘটাতে এবছরও জেলায় প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার খামার ও কৃষকের বাড়িতে ২ লক্ষাধিক গরু-মহিষসহ বিভিন্ন প্রজাতির কুরবানীর পশু মোটাতাজা বা হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। ন্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হবে।

কুরবানীর পশু বিক্রির উদ্দেশ্যে এ জেলায় সাড়ে ২ লাখ গরু মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে কয়েক হাজার গরু মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। কেউ শখের বশে, কেউ বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে, কেউ সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে এসব খামার গড়ে তুলেছে। তবে পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় গরুর পালন করতে এবার খরচও হয়েছে অনেক বেশি।

বিভিন্ন খামারী ও পশু পালনকারী কৃষকরা বলছেন, পশু খাদ্যের দাম বেড়েছে, তাই বাড়তি দামে পশু বিক্রয় করতে না পারলে লোকসান গুণতে হবে, হারাতে হবে পুঁজি। জেলায় সবচেয়ে বেশী কুরবানীর পশু প্রস্তুত করা হয়েছে সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলায়। এবছর এ উপজেলায় অর্ধলক্ষ গরু ও ছাগল প্রস্তুত করেছেন খামারীরা। খামারীরা জানান, পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু লালন পালনে খরচ বেড়েছে। তাই ন্যায্য মূল্য না পেলে লোকসান গুনতে হবে। তবে তারা লাভের আশা করছেন। আবার পশুর খামারে কাজ করে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। দিন-রাত পরিচর্যা করে কুরবানীর পশুর হাটে পশুগুলি তুলতে শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারাও। কোন ক্ষতিকর ও ভেজাল খাদ্য ছাড়া দেশীয় পদ্ধতিতে খাবার খাইয়ে গরু মোটাতাজা বা হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে।

এদিকে কুমারখালীতে কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রায় তিন হাজার ৫৯৭টি খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৪০০টি পশু।

শেষ মুহূর্তেই পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন খামারি ও পশু মালিকরা। এবার উপজেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টি। যা গতবছরের তুলনায় দুই হাজার ৭৯৩টি বেশি। তবে সমপরিমাণ খামারে এবছর এক হাজার ১৬৬টি পশু কম পালন করেছে খামারিরা।

তবে দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাড়তি পরিচর্যা খরচ। হাটে বাইরের ক্রেতা আসবেন কি না? এসবসহ নানাবিধ কারনে ঈদে পশু বিক্রি ও লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে খামারিরা। খামারিরা বলছেন, কুরবানির পশু বাজারে তোলার সময় ঘনিয়ে আসছে। গত করোনার পর থেকে তেমন লাভ করতে পারেননি। এবারও পরিমিত লাভের আশায় সারা বছর পশু পালন করেছেন। কিন্তু দেশের চলমান পরিস্থিতি। পশুখাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বেশি। তাই খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ। তাছাড়া মানুষের ব্যয় বাড়লেও বাড়েনি আয়।

সে জন্য পশু বিক্রি হবে কিনা, বিক্রি হলেও আশানুরূপ লাভ হবে কিনা, সরকার বাইরের দেশ থেকে গরু আমদানি করবে কিনা- এসব নিয়ে শঙ্কিত খামারিরা।

প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে এ বছর ঈদ সামনে রেখে তিন হাজার ৫৯৭টি খামারে মোট ২২ হাজার ৪০০টি পশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। এরমধ্যে ষাড় ১২ হাজার ৯১৭টি, গাভী এক হাজার ৩৬৭টি, ছাগল ৭ হাজার ৯৭৬টি, ভেড়া ১৪০টি। উপজেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টি। যা গত বছর ছিল ১২ হাজার ২০৭টি। তবে নানা কারণে এ বছর খামারে পশুর সংখ্যা কমেছে এক হাজার ১৬৬টি। খামারীদের পরামর্শ সহ সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আল মামুন হোসেন মন্ডল। কুরবানীর ঈদকে সামনে রেখে ছোট বড় বা ক্ষুদ্র খামারীরা পশু পালন করে থাকেন। দিন-রাত পরিশ্রম ও পরম যতেœ লালন পালন করা পশুটি বিক্রয়ে লোকসান হলে পরবর্তীতে পশু পালনে আগ্রহ হারাবেন এমনটি জানিয়েছেন তারা। জেলার উন্নত মানের পশু একদিকে যেমন দারিদ্র বিমোচনে বেকার সমস্যায় ভূমিকা পালন করছে। অপরদিকে মাংসের চাহিদা পূরণে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। এ বছর জেলার পালিত পশু কুষ্টিয়ার মাংসের চাহিদা পূরণ করে বাইরে পাঠানো যাবে।