মো. রফিকুল ইসলাম কালিগঞ্জ, (সাতক্ষীরা) : কালিগঞ্জ উপজেলায় এখান থেকে প্রায় ২০-৩০ বছর পূর্বে দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারগুলো প্রচুর পরিমাণ পাওয়া যেত, আর মৎস্য শিকারা একটু কম মাছ পেলে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রি করত তাতে তাঁদের সংসার ভালো ভাবে চলত।
সাতক্ষীরা জেলার ইতিহাস বই সূত্রে জানা যায়, কালিগঞ্জে বিলের সংখ্যা প্রায় ৩৬টি, খাল ৪৬টি, পুকুর ৯,৯৬০টি রয়েছে।
এক সময় দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছে গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারগুলো সয়লাব হয়ে যেত। এখন আর সেসব মাছ দেখা যায় না। কালিগঞ্জের চৌবাড়িয়া গ্রামের জেলে এরশাদ আলী, হোসেন আলী, সাইদুর রহমান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, এমন এক সময় ছিল বিলে-খালে মাছ ধরার জন্য ঘুনি, ফাঁস জাল দিয়ে অনেক রকমের দেশী মাছ ধরেছি কেউ বাঁধা দিত না। এখন কালের আবর্তনে সে সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। দেশী মাছ আর জেলেদের জালেও ধরা পড়ে না। দেশীয় এসব মাছের মধ্যে রয়েছে কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, ডারকা, মলা, ঢেলা, চেলা, শাল চোপরা, শৌল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বুড়াল, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, মালান্দা, খরকাটি, গজার, শবেদা, চেং, গুলে, টাকি, চিতল, গতা, পোয়া, বালিয়া, কাকিলা, গুত্তুম, বৌরানীসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি মিঠা পানির বিভিন্ন ধরনের মাছ।
ব্রজপাটুলী গ্রামের আব্দুস ছুবহান কারিকার, সাতবসু গ্রামের মোঃ ফজর আলী কারিকর,শুইলপুর গ্রামের মোঃ নুর ইসলাম খাঁ, বাগবাটী গ্রামের আবেদীন গাজী তাঁরা জানান, এক সময় বর্ষাকালে আমরা এলাকার ভাষায় খেপলা জাল, বিভিন্ন ধরণের ঘুণি, দোন, ফাঁস জাল পেতে বিভিন্ন জাতের দেশী মাছ ধরেছি তখন খাল বিল উন্মক্ত ছিল কেউ কিছু বলতো না। বিলে-খালে পাটা দিয়ে ঘুণি পেতে কৈ, শৈল, চ্যাং, বেতলা, টেংড়া, চিংড়ি, গুলে, মাগুর, শিং প্রচুর পরিমাণ ধরেছি। এখন বিল গুলোতে ঘের করার কারণে, ঘের অধিক লাভের আশায় দেশী মাছ গুলোন বাদ দিয়ে বিভিন্ন জাতের পোনা মাছের চাষ করছে।
এসব মাছ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে অন্তত ১৪টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এরমধ্যে জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ ধরে ফেলা, ডোবা-নালা-পুকুর ছেঁকে মাছ ধরা, বিদেশি রাক্ষুসে মাছের চাষ ও মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটানো।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ১৪টি কারণে ৫০টির বেশি দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রাম বাংলায় পৌষ-মাঘ মাসে পুকুর, খাল, ডোবা, পানি কমতে থাকলে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। এখন সেসব দেখা যায় না। বর্ষাকালে ধানের জমিতে ফাঁস জাল, বড়শি ও ঘুনি পেতে মাছ ধরার রীতিও হারিয়ে গেছে অনেক এলাকা থেকে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বাজার থেকে চাষের মাছ কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।