নিকলী কিশোরগঞ্জ থেকে আহসানুল হক জুয়েল : কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়াঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলে খ্যাত হাওড় উপজেলা নিকলী এবং বাজিতপুর উপজেলা নিয়ে কিশোরগঞ্জ ৫ আসন গঠিত। এই আসনে পূর্ব পাকিস্তান আমলের গভর্নর মোনায়েম খান থেকে শুরু করে অসংখ্য খ্যাতিমান দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্মস্থান। এছাড়াও বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পপতি জহিরুল ইসলাম সহ অসংখ্য শিল্পপতি এবং জ্ঞানী-গুনীরও জন্ম এই নির্বাচনী এলাকাতেই। বর্তমানে পর্যটন এলাকা হিসেবে সুপরিচিত নিকলী উপজেলা। নিকলী একটি প্রাচীন জনপদের সুপরিচিত নাম। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন নৌ-বাহিনী প্রধান রিয়াল এড মিরাল মাহবুব আলী খান নিকলী থানা কে উপজেলা ঘোষণা করেন। অপরদিকে ১৮৬৯ সালে বাজিতপুর উপজেলার প্রাচীন এই পৌরসভায় জন্মগ্রহণ করেন এক সময়ের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিও। যিনি নিজ উদ্যোগেই গড়ে তোলেন তাহার নিজ গ্রাম ভাগলপুরে বাংলাদেশের সেরা অন্যতম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ইতিমধ্যেই এই হাসপাতালের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা এখানে ডাক্তারি পড়তে আসেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) সংসদীয় আসনটি ছিলো দীর্ঘদিনের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিএনপির দলীয় অন্তকোন্দলের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নানাবিধ কারণে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৮ সালের অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে এবং পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী কৌশলে ২০১৪ সাল হতে আ’লীগের ঘাঁটিতে পরিণত করে নিলেও গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম না থাকায় এই আসনে রাজনীতির মেরুকরণ সম্পূর্ণরূপে পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি বর্তমানে এই আসনের মাঠটি দখল করে আছে। এই আসনের দুই উপজেলাতেই বিএনপি’র যথেষ্ট পরিমাণে দলীয় কোন্দল রয়েছে। এই কোন্দল অব্যাহত থাকলে নির্বাচনী মাঠের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

জানা গেছে, বাজিতপুর উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও নিকলী উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন (নিকলী বাজিতপুর-১৬৬) কিশোরগঞ্জ ৫, নিকলী-বাজিতপুর উপজেলার নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ তথ্যমতে, বাজিতপুর উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১লাখ ৯৪ হাজার ৬৯০ জন আর নিকলী উপজেলায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৭ জন। এ আসনে সর্বমোট ভোটার ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭ জন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলার সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে চলছে ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ঘন ঘন এলাকায় আসতে দেখা গেছে। নিকলী-বাজিতপুরের সর্বস্তরের সকল মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে উঠেছে কে পাবে ধানের শীষ প্রতীক। কারণ এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি হতে প্রায় ১০ জন প্রার্থী মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। জোটের শরিকদের কেউ, নাকি বিএনপির নেতাদের কেউ। আগ্রহী প্রার্থীদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নিবার্হী কমিটির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল এবং বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ঘিরে। সৈয়দ এহসানুল হুদাও শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের বাড়িও বাজিতপুরেই। একটি সূত্রে জানা গেছে এবার নিকলী বাজিতপুর আসনে ১৪ দলীয় জোট থেকে এহসানুল হুদাকে মনোনয়ন দেয়া হবে। বিগত কয়েক মাস আগে রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক পত্রে নিকলী বাজিতপুরের বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল হোসেনকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে তিনি বিগত ফ্যাসিবাদী আমলেও মনোনয়ন পেয়েছেন। দুঃসময়ে কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন। স্বজনদের দৌড়ঝাঁপও রয়েছে উপর মহলে। তাই তার সমর্থকদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনিই মনোনয়ন পাবেন। ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়া মানেই এ আসনে সংসদ সদস্য হয়ে যাওয়া। তবে ইকবালের রাজনৈতিক কর্মকা-কে ঘিরে পক্ষে এবং বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনাও রয়েছে তৃণমূলে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় চিঠিসহ তার পক্ষে নিকলী বাজিতপুরের নেতাকর্মীদেরকে সহযোগিতা করারও বিষয়েও মনোনয়নের ইঙ্গিত মিলেছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে চলেছেন তার সমর্থকরা। এছাড়াও গুঞ্জন রয়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুনজর রয়েছে তার দিকে। মনোনয়ন পেলে সাধারণ মানুষ মন খুলে কথা বলার সুযোগ পাবে বলেও তার সমর্থকরা উল্লেখ করেন। অপরদিকে হুদার ব্যাপারে আলোচনা সমালোচনা রয়েছে তিনি এলাকার বাইরে থাকায় তাহার রাজনৈতিক দলের কর্মকান্ড তেমন চোখে পড়ে না এবং এই আসনে তার দলীয় কার্যক্রম অতীতে চোখে পড়েনি।

জানা যায় কিশোরগঞ্জ ৫ আসনে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনজুর আহমদ বাচ্চু মিয়া আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আমির উদ্দিন আহমেদ (সতন্ত্র)।

১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে আমির উদ্দিন আহমেদ সংসদ নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আ’লীগের এ্যাডভোকেট আঃ লতিফ। ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানের পুত্র এডভোকেট খালেকুজ্জামান হুমায়ূন খান (মুসলিম লীগ) প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক রতন ১৪ দল (ন্যাপ-মোজাফ্ফর)। ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মফিজুর রহমান রোকন তার প্রতিদ্বন্দ্বী মরহুম এ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম (জাতীয় পার্টি)। ১৯৯১ সালে আমির উদ্দিন আহমেদ (বিএনপি) নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন মরহুম এডভোকেট আঃ লতিফ (আ’লীগ)। ১৯৯৬ সালে দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রথমটি ১৬ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে প্রথমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি থেকে সংসদ নিবাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কিশোরগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক মরহুম আমির উদ্দিন আহমেদ আর দ্বিতীয়বারে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে মরহুম মজিবুর রহমান মঞ্জু নির্বাচিত হন। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এডভোকেট আলাউল হক (আ’লীগ)। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই আসনেই প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মরহুম মজিবুর রহমান মঞ্জু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মরহুম রাষ্ট্রপতি এডভোকেট জিল্লুর রহমান। উল্লেখ্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বিএনপি’র প্রার্থীর কাছে ১০ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে হেরেছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হতে বিশিষ্ট শিল্পপতি ও জুতা ব্যবসায়ী আফজল হোসেন নির্বাচিত হন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মজিবুর রহমান মঞ্জু ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আফজাল হোসেন আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পাশাপাশি ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিত পাতানো নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে টানা তিন বারের মত আ’লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। উল্লেখ্য এই আসনে ফ্যাসিস্টের দোসর জাতীয় পার্টির কোন প্রকার কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

এ দিকে-এই আসনে বিএনপি বা শরিক দলের একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরারা সদস্য ও জেলা আমীর অধ্যাপক মো. রমজান আলী। এই আসনে দলমত নির্বিশেষে সর্বমহলে আলোচনা রয়েছে অধ্যাপক রমজান আলী একজন ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবীদ। সততা যোগ্যতায় তিনি একজন অন্যতম যোগ্য প্রার্থী। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে নাম ঘোষণার পরপরই সারা জেলায় দলীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি নিজ আসনে দিনরাত ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়মিত সভা সমাবেশ করছেন। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এদিকে বিএনপির এ আসনে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বিরাজমান রয়েছে তা অব্যাহত থাকলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী চমক দেখাতে পারেন বলে স্থানীয় ভোটাররা এবং সচেতন মহল মনে করছেন। জনমত জরিপে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক রমজান আলী এগিয়ে রয়েছেন। সরেজমিনে তরুণ ও সচেতন ভোটারদের মতামত অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ভোট হলে ভাগ্য খুলতে পারে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের।

নিকলী বাজিতপুর উপজেলার ভোটার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর মরহুম আবদুল মোনায়েম খানের বাড়ি বাজিতপুরের হুমায়ুনপুর। মুসলিম লীগের সমর্থক ও ডানপন্থীদেরও বড় একটি সমর্থক শ্রেণী রয়েছে এই আসনে বিশেষ করে বাজিতপুর উপজেলায়। যে কারণে বেশির ভাগ সময় এ আসনটি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী বিরোধীদের’ দখলে থেকেছে। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আরো নেতারা হলেন বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এহেসান কুফিয়া, ইটালি প্রবাসী বদরুল আলম শিপু, বাজিতপুরের বিএনপি নেতা জি.এস.মীর জলিল ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মামুন। উল্লেখ্য মামুনের পিতা মরহুম মজিবুর রহমান মঞ্জু দুইবার বিএনপি থেকে মনোনীত এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু। উল্লেখ্য মিঠুর পিতাও মরহুম আমির উদ্দিন আহমেদ তিনবারের বিএনপি’র সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে ১৯৯৬ সালে আমির উদ্দিন আহমেদ দ্বিতীয় দফায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হলে দলের বিতর্কিত অবস্থানে চলে যান। এবং কিছুদিনের জন্য কর্নেল (অব:) অলির এলডিপিতে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে পুনরায় বিএনপিতে চলে আসেন। এছাড়াও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শফিকুল আলম রাজনসহ কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসাধারণ সম্পাদক ও নিকলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী মাসুক মিয়ার নামও শোনা যাচ্ছে। তাছাড়াও প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুম। তার বাড়িও বাজিতপুরেই।