চারঘাট (রাজশাহী) সংবাদদাতা: রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নন্দনগাছী হাটে দুইতলা বিশিষ্ট আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি তিন বছরেরও কম সময়ে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ছয় বছর পার হলেও তা এখনও অসম্পূর্ণ। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ওই হাটের ৮২ জন ব্যবসায়ী, যাদের দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়েছিল উন্নয়নের আশ্বাসে। কিন্তু তারা আজো ঘর ফিরে পাননি। হারিয়েছেন ব্যবসা, পুঁজি এবং জীবনের নিরাপত্তাও।
নন্দনগাছীতে তিন দশক ধরে মুদি দোকান করে আসছিলেন মফিজুল ইসলাম। মার্কেট প্রকল্পের ঘোষণা আসতেই তিনি তৎকালীন বাজার কমিটির সভাপতির হাতে ৫০ হাজার টাকা জমা দেন, এক বছরের মধ্যে দোকান পাবেন- এই প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দোকান তিনি পাননি। মফিজুল বলেন, “প্রথমে নানা প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করল। দোকান পাওয়ার আশায় আমি নেতার হাতে টাকা দিলাম। এখন আবার শুনছি নতুন কমিটি হয়েছে, তারা নাকি আবার টাকা চাইবে। আমাদের ব্যবসা তো শেষ হয়ে গেছে।” নন্দনগাছি বাজারের আল মামুন ট্রেডার্সের পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, “নিমপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বাজার কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম ও বিশ্বস্ত সহযোগী হুমায়ুন কবির প্রতিটি দোকান মালিকের কাছ থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকা করে নিয়েছেন, সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও জমা নিয়েছেন। কিন্তু এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না, আদৌ আমরা আমাদের দোকান ফিরে পাবো কিনা। দোকান ভাঙার পর থেকে অনেক ব্যবসায়ী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে কোনোরকমে জীবন চালাচ্ছেন। আমাদের কষ্টের কথা কেউ বুঝতে চায় না, আর আমরা বুঝিয়ে বলবোই বা কাকে? দোকান পাবো কি না, সে ব্যাপারে এখনো গভীর অনিশ্চয়তায় আছি। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত এই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান কামনা করছি।” চাল ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম বলেন, বছরখানেক আগে মার্কেটের দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। এরপরও ঘর বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। প্রশাসনের বা বাজার কমিটির কারো কাছে গেলেই অপমানজনক আচরণ করা হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দের নামে তাদের কাছ থেকে ব্যাপক হারে টাকা নেয়া হয়েছিল। বিষয়টি তদারক করতেন তৎকালীন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম এবং সাধারণ সম্পাদক জুলহাস ইসলাম লিটন। এছাড়া স্থানীয় যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতারাও সরাসরি পজিশন বরাদ্দ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে বাজার কমিটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ নান্টু। তিনি বলেন, “আগের কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। আন্দোলনের পর তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ব্যবসায়ীদের দাবিতে আমি এখন কমিটির দায়িত্বে আছি। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি-সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া এক টাকাও নেয়া হবে না।” ২০১৮ সালে দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নে নন্দনগাছী হাটে আধুনিক মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ। দুইতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য ৪২ শতক জমি ফাঁকা করে ব্যবসায়ীদের দোকান উচ্ছেদ করা হয়। কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল মিম ডেভেলপার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রকল্পের শুরুর নির্ধারিত তারিখ ছিল ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর, আর শেষ হবার কথা ছিল ২০২১ সালের ১০ মার্চ। কিন্তু নির্মাণের শুরুতেই সয়েল টেস্ট, নকশা জটিলতা এবং পরে করোনা মহামারীর কারণে কাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। উপজেলা প্রকৌশলী রতন কুমার বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজের গতি বাড়িয়েছি। অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে দোকান হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।