আম উৎপাদন ও রপ্তানির বিদ্যমান অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শনের লক্ষ্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র ভাইস-চেয়ারম্যান মোঃ আনোয়ার হোসেন গতকাল সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফর করেন। এ সময় তিনি রপ্তানিযোগ্য আমের বাগান পরিদর্শন, স্থানীয় উৎপাদকবৃন্দের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তথ্য আহরণ ও এসব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে মত-বিনিময় করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত সভায় তিনি আম উৎপাদক, রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষসমূহের সাথে আলোচনা করেন।

নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এবং ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ফল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশে ও বিদেশে ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রায় ৭০ প্রজাতির ফল উৎপাদিত হলেও এর ক্ষুদ্র একটি অংশই বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হয়। ফলে কাক্সিক্ষত পরিমাণ রপ্তানিযোগ্য ফলের উৎপাদন এখনও সম্ভব হয়নি। আম, আনারস, আমড়া, কলা, কমলা, কাঁঠাল, কুল, তেঁতুল, তরমুজ, পেয়ারা, পেঁপে, বেল, মালটা, লেবু, লিচু, কদবেল, লটকন, শরিফা, নারিকেল ইত্যাদির চাহিদা অনেক বেশি। সুস্বাদু ফল হিসেবে আমের অবস্থান সবার উপরে। তাই উন্নতমানের আমের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চলছে নানামুখী কর্মকান্ড। ২০২৫ এ তাজা ফলের বৈশ্বিক বাজারের আকার প্রায় ৭৭৮.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিভিন্ন দেশ হতে ৫০০ হতে ১,০০০ জাতের আম রপ্তানি হয়ে থাকে। আমের আন্তর্জাতিক বাজারের আকার ২০২৪ সালের ৬৭.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৭১.৯৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। বার্ষিক ৮% চক্রবৃদ্ধি হারে (ঈঅএজ) বেড়ে ২০২৯ সালে বাজারটি ৯৭.৮২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে মর্মে বাজার গবেষণা বলছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত রপ্তানিযোগ্য আমের মধ্যে ল্যাংড়া, ফজলি, হিমসাগর, খিরসাপাত, বারি-২, বারি-৩, বারি-৭ এবং আশ্বিনা জাতের আম বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এমনকি দেশী জাত ছাড়া এখন কাটিমন, তোতাপুরী, ন্যাম ডক মাই, মিয়াজাকি, অ্যালফ্যানসো, কেইট, পালমার ইত্যাদি বিদেশী জাতের আমও এ দেশে সীমিত আকারে চাষ করে সাফল্য পাওয়া গেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে ২.২৯ লাখ হেক্টর জমিতে ২৩.৫০ লাখ মেট্রিক টন আমের ফলন হয়। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭.৭ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২.৫ লাখ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয় এবং উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৫.৮৯ লাখ মেট্রিক টন। আম, কাঁঠাল এবং পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে যথাক্রমে ৭ম, ২য় ও ৮ম স্থানে অবস্থান করছে। আর মৌসুমী ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১০ম। আয়তনে ছোট হলেও প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে ফল চাষের ক্ষেত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১০ বছরে দেশে আমের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে আম হতে কাঁচা আম ফালি বা আমচুর, চাটনি, মোরব্বা এবং পাকা আম হতে জুস, ফ্রুট বার, পুডিং, আমসত্ত্ব, জ্যাম, জেলি ইত্যাদি প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমের ফালি শুকিয়ে প্যাকেটজাত করে রপ্তানির প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এসব খাদ্যে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে, পটাশিয়াম, বেটা-ক্যারোটিন, ফলেট, কোলাইন ও ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে থাকে যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

আমের বেশ কয়েকটি প্রজাতি ইতোমধ্যেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যেমন- চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি, নওগাঁর নাক ফজলি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া, আশ্বিনা ও রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা। বর্তমানে আম্রপালি ও গোপালভোগ আমের কদর অনেক বেশি। গত ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ (জুলাই-এপ্রিল) অর্থবছরে আম রপ্তানির বিপরীতে আয় হয়েছে যথাক্রমে ০.৪০, ১২.৭১, ২.৬৭ ও ২.৭৭ (আংশিক) লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ থেকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ যাবৎ যুক্তরাজ্য, হংকং, কানাডা, বাহরাইন, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও সুইডেন এ আম রপ্তানি হয়েছে। এসব আমদানি গন্তব্যের মধ্যে যুক্তরাজ্যে সর্বাধিক আম রপ্তানি হয়েছে। আম উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলো হচ্ছে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মেক্সিকো, বাংলাদেশ, ব্রাজিল ও নাইজেরিয়া। আবার আম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, পেরু, নেদারল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, স্পেন ও ইকুয়েডর শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। চীনা সরকারের আগ্রহের প্রেক্ষিতে সে দেশে আম রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প এর মাধ্যমে সংগৃহীত স্থানীয় আম উৎপাদক ও রপ্তানিকারকবৃন্দের তালিকা নির্ধারিত ফরমে চীনা দূতাবাসে ইতোমধ্যেই প্রেরণ করা হয়। সে দেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলে রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু হবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে।

আমের শেলফ লাইফ বৃদ্ধিকরণ, পর্যাপ্ত হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সুবিধা তৈরিকরণ, রাসায়নিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, উন্নতমানের প্যাকেজিং, দেশের বাণিজ্যিক আম উৎপাদকগণকে একটি অভিন্ন ছাতার আওতায় আনয়ন, ফ্রুট ফ্লাই এর উপদ্রব হ্রাসকরণ, উত্তম কৃষি চর্চার যথাযথ অনুসরণ, স্যানিটারি ও ফাইটো-স্যানিটারি সম্পর্কীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ, কুল চেইন বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়ে যত দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হবে, তত দ্রুত আমাদের দেশের আমের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে মর্মে প্রতীয়মান। রপ্তানি প্রসারমূলক এসব কার্যক্রমে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সাথে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কাজ করবে মর্মে আম উৎপাদক ও রপ্তানিকারকবৃন্দকে আশ্বস্ত করা হয়।এ সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের পক্ষ থেকে কৃষিভিত্তিক একটি ইপিজেড স্থাপন, আম নীতিমালা প্রণয়ন, বাগানসমূহে সোলার প্যানেল স্থাপন, আম উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের ঋণদান জোরদারকরণ, প্রান্তিক পর্যায়ে কোয়ারেন্টাইন সুবিধা, রাজশাহী হতে আম সরাসরি বিমানে জাহাজীকরণ, প্যাকিং হাউজ সুবিধা স্থাপনের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ঢাকায় একটি আমের মেলা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়াও এ সময় ইপিবি ভাইস-চেয়ারম্যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত রেশম শিল্প ও হস্তশিল্প পরিদর্শন করেন এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ খবর নেন।