মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পর অবশেষে মোংলা বন্দরকে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বন্দর প্রতিষ্ঠার প্রায় ৭৩ বছর পর ২০২৪ সালের ১ জুন খুলনা-মোংলা রেললাইন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্যসমূহকে নিরাপদ, সময়-সাশ্রয়ী ও অর্থনৈতিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন নিশ্চিত করা।

এতে ব্যবসায়ীরা যেমন সুবিধা পাবেন, তেমনি মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি আশা করা হয়েছিল।

এই লক্ষ্যেই প্রায় ৪,২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ খুলনা-মোংলা রেলপথ। এতে রয়েছে রূপসা নদীর ওপর ৫.১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু, ১০৭টি ছোট-বড় ব্রিজ, ৯টি আন্ডারপাস এবং ১১টি আধুনিক স্টেশন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে ভারত সরকারের ঋণ সহায়তায় এবং ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (খ্ঞ) ও ইরকন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে।

তবে উদ্বোধনের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও রেলপথটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বর্তমানে শুধুমাত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন-মোংলা কমিউটার (৯৫/৯৬)’, মোংলা থেকে বেনাপোল রুটে চলাচল করছে। প্রতিদিন এই ট্রেনটি মোংলা থেকে দুপুর ১টায় ছেড়ে যায়, যার কারণে অফিসগামী বা নিয়মিত কর্মজীবী যাত্রীরা বাস্তবে তেমন উপকার পাচ্ছেন না। সময়সূচি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও রয়েছে, কারণ এটি দৈনন্দিন যাতায়াতের সুবিধাজনক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অন্যদিকে, এখনো কোনো নিয়মিত পণ্যবাহী ট্রেন চালু হয়নি। রেল চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুটি জাহাজের আমদানিকৃত অল্প কিছু পণ্য রেলপথে পরিবহন করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। ফলে বন্দর ও আশেপাশের অঞ্চলের জনগণ প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (বোর্ড ও জনসংযোগ বিভাগ) মাকরুজ্জামান জানান, মোংলা বন্দর বর্তমানে সম্পূর্ণ সচল এবং নৌ ও সড়কপথে নিয়মিত পণ্য পরিবহন চলছে। রেলপথ ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১,৭২১ কোটি টাকা, তবে একাধিকবার সময় ও ব্যয় সংশোধনের ফলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,২৬১ কোটিতে। ২০১০ সালে প্রকল্পের ধারণা ও নকশা প্রণয়ন শুরু হয়, এরপর প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা দফায় বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত এটি চালুর উপযুক্ত অবস্থায় আনা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এত বিপুল ব্যয়ের প্রকল্পটির অর্থনৈতিক রিটার্ন প্রত্যাশিত হয়নি। বৃহৎ অবকাঠামো কার্যত অলস পড়ে থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে প্রকল্পটিকে “লক্ষ্যভ্রষ্ট” বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

এছাড়া, ভারত বাংলাদেশ রেল সংযোগ প্রকল্পের কিছু অর্থায়ন ও নির্মাণ পর্যায়ে সাময়িক স্থগিতাদেশের কারণে আঞ্চলিক ট্রানজিট নির্ভর কার্গো পরিবহন পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল-নির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খলার প্রাথমিক রোডম্যাপ বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও অবকাঠামো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পেতে হলে মোংলা বন্দর থেকে নির্দিষ্ট রুটে নিয়মিত কার্গো ট্রেন চালু করা এবং রেল-বন্দর-শুল্ক-লজিস্টিকস ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় স্থাপন জরুরি। একইসঙ্গে বেসরকারি অপারেটর ও শিপারদের জন্য প্রণোদনামূলক নীতি এবং লোড গ্যারান্টি মডেল চালুর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।