তৌফিক রুবেল, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : কুমিলার দাউদকান্দি পৌর বাজারের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘বলদা খাল’ একসময় ছিল বাজারের জীবনরেখা-পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম এবং নৌপথে পণ্য পরিবহনের একমাত্র উপযোগী খাল। গোমতী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি দিয়ে একসময় নৌকা বোঝাই মালামাল নিয়ে বাজারে আসতেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। খালের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করতেন খালপাড়ের বাসিন্দারা, শিশুরা সাঁতার কাটত আনন্দে। ভারী বর্ষণ কিংবা বন্যার সময়েও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ফলে পৌরবাজার থাকত নিরাপদ কিন্তু আজকের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একসময়ের স্বচ্ছ ও প্রবাহমান বলদা খাল এখন যেন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে খালটি এখন প্রায় মৃতপ্রায়। যেখানে আগে চলত নৌকা, সেখানে এখন জমে আছে পচা পানি ও আবর্জনার স্তুপ। খালের আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে রোগজীবাণু ও মশা-মাছির উপদ্রব। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা যার ফলে স্থানীয়রা বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগে ভুগছেন। জানা যায়, গোমতী নদীর নছর”দ্দী এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়ে বলদা খাল দৌলদ্দী, মাইজপাড়া, সহাপাড়া হয়ে দাউদকান্দি পৌরবাজারের মডেল থানা ও ভূমি অফিসের সামনে পুকুরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় চার কিলোমিটার।এই খাল দিয়েই দাউদকান্দির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নৌকাযোগে পণ্য নিয়ে পৌরবাজারে আসতেন। সেই খালটিই আজ ভরাট, দখলকৃত এবং ময়লার স্ত’পে পরিণত।সরেজমিনে দেখা গেছে খালের পশ্চিম অংশ এখন লতাপাতায় ঢাকা, কোথাও ভরাট হয়ে গেছে, আবার কোথাও জমে আছে পচা পানি। বাজারসংলগ্ন অংশে খালের ওপরে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। স্থানীয়রা জানান, এই খালটি একসময় পৌরবাজারের পানি প্রবাহ ও পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত¦পূর্ণ ছিল।স্থানীয় বাসিন্দা আবু সাঈদ রমিদ বলেন,“খালটি এখন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। আগে এটা আমাদের জন্য আশীর্বাদ ছিল, এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ খালটি যেন দ্রুত খনন করা হয়।”বাজারের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম রাজিব বলেন,“বলদা খাল একসময় আমাদের বাজারের প্রাণ ছিল। এখন দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটা সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। আমরা দ্রুত খনন ও পুনরুদ্ধারের দাবি জানাই।”এই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. বিল্লাল হোসেন সুমন বলেন,“বলদা খাল একসময় দাউদকান্দির পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহের মূল মাধ্যম ছিল। আমরা এখানে সাঁতার কাটতাম, জোয়ার-ভাটার পানি আসত। সময়ের বিবর্তনে খালটি দখল ও দূষণে বেদখল হয়ে গেছে। আমরা পরিকল্পনা করেছি খালটি উদ্ধার করে দু’পাশে ওয়াকওয়ে তৈরি করা হবে, যাতে এটি আবার একটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্থানে রূপ নেয়।” ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজের শিক্ষক সাইফুর রহমান সবুজ বলেন,“আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে খালটি গেছে। এখন সেখানে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণুতে টেকা দায়। শিক্ষার্থীরা নাক চেপে কলেজে আসে। খালটি দ্রুুত খনন করা জরুরি।”স্থানীয় পরিবেশকর্মী লিটন সরকার বাদল বলেন,“বলদা খাল একসময় দাউদকান্দির প্রাণ ছিল। আমরা চাই খালটি দখল ও দূষণমুক্ত হয়ে আবার আগের রূপ ফিরে পাক। পানি প্রবাহমান থাকুক, নৌকা চলুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক রেদওয়ান ইসলাম বলেন,“আমরা ইতোমধ্যে কয়েকবার খাল পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। শীঘ্রই অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এটি সম্পন্ন হলে খালটি তার পূর্বের রূপ ফিরে পাবে এবং পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।”দাউদকান্দি পৌর বাজারের প্রাণ বলদা খাল এখন ধুঁকছে দূষণ ও দখলের চাপে। একসময় যে খাল দিয়ে জীবিকা, যোগাযোগ ও সৌন্দর্য মিশে ছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে জনদুর্ভোগের প্রতীকে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বলদা খাল আবারও ফিরে পাক তার পুরনো জীবন ও সৌন্দর্য, হয়ে উঠুক দাউদকান্দির গর্বের প্রতীক।