হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : রাক্ষসী পদ্মায় তিনবার আমার বাড়ি ঘর সব বিলীন হয়ে গেছে । এহন অন্যের জমির উপরে পুরান টিন আর ছনের বেড়া দিয়া ঘর কইরা থাকতাছি। আর মাত্র হাত পনের ভাংলেই আমার ঘরে আইসা ঠেকবো। এইটুকুও যদি ভেঙে যায় নতুন করে আর ঘর করার সামর্থ্য নাই আমার। রাতের বেলা যহন ঘরে একা থাকি তহন নদীর গর্জন শুনলেই দুই চোখ বাইয়া পানি পড়ে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের পদ্মানদীর ভাঙনের কবল থেকে বাড়িঘর বাঁচাতে জরুরী ভিত্তিতে জিও (জিওটেক্সটাইল) ব্যাগ ফেলার দাবিতে এক গণ সমাবেশে আসা ভুক্তভোগী স্বামী সন্তানহারা হাফিজা বেগম (৬০) এভাবেই কথাগুলি বলছিলেন।

গত শনিবারবেলা দুপুরে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের মালুচী গ্রামে এই গণসমাবেশের আয়োজন করে এলাকাবাসী। গণসমাবেশের দুই শতাধিক ভুক্তভোগী পরিবার অংশগ্রহণ করেন।

গণসমাবেশে আসা ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, মালচি গ্রামের ২ নং ওয়ার্ডে দুই শতাধিক পরিবারের সহস্ত্রাধিক বাসিন্দা চলমান নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। ইতিমধ্যে এখানে নদী ভাঙতে-ভাঙতে ৩০ মিটার বসতির ভিতরে ঢুকে পড়েছে। এখন থেকে জরুরী ভিত্তিতে এখনে জিও ব্যাক ফেলা না হলে বাকি পরিবার গুলোও ভাঙ্গনের শিকার হবে।

গণসমাবেশে আসা মৃত ইসাক আলী প্রামাণিকের স্ত্রী শতবর্ষ ছুঁইছুঁই নেছা বেগম (৯০)বলেন, আমার একমাত্র মেয়ে ছিলো সে আগেই মারা গেছে।

স্থামীর রেখে যাওয়াা ১১ শতাংশ ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নাই । মেয়ের ঘরের একমাত্র নাতি লালচান (৩৫) এর সাথে এই বসত বাড়িটাতেই থাকি। লালচান পেশায় একজন কৃষক।কৃষিকাজই তাদের জীবিকার একমাত্র পথ।।তাদের ভিটেবাড়ি থেকে মাত্র ১০ মিটার দূরেই বয়ে চলেছে খরস্রোতা রাক্ষসী পদ্মা। এই রাক্ষসী পদ্মার ভয়াল থাবায় যেকোনো মূহুর্তে বিলিন হয়ে যাবে তার শেষ সম্বল মাথাগুজার ঠাই বাড়িটুকুও। এসময় তার দুচোখ বেয়ে

অঝড়ে পানি ঝড়ছিলো।কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন,আমি যতদিন বেঁচে আছি, স্বামীর রেখে যাওয়া মাটিতে জানি থাইকা যাইতে পারি।’

স্বামী সন্তানহারা হাফিজা বেগম বলেন, এই পদ্মায় তিনবার আমার বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে । এখন অন্যের জাগায় থাকি। এটুকুও যদি ভেঙ্গে যায় নতুন ঘর করার আর সামর্থ্য নাই আমার। তিনি আরো বলেন,স্বামী মরার পর দুই ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে আমায় ছেড়ে চলে গেছে। কেউ কোন খোঁজ খবর নেয় না। কয়েকটা ছাগল পালি, এই দিয়েই চলি।’

সমাবেশে কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি খোরশেদ আলম খান, সাধারণ সম্পাদক মো. আজহারউদ্দিন, ২ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার ইদ্রিস আলী, সুইজারল্যান্ড প্রবাসী আব্দুর রহমান বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি খোরশেদ আলম খান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষগুলো খুবই নিরীহ। কৃষিকাজই আমাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। আমরা দীর্ঘ বছর ধরেই ভাঙনের শিকার হচ্ছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো জানিয়েছি, তারা দেখে গেছে। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলতো তাহলে ভাঙ্গন থেকে আমরা বাঁচতে পারতাম।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, মালুচী এলাকাতে জরুরী কিছু কাজের জন্য আমরা দপ্তরে জানিয়েছি। আশা করছি জরুরী ভিত্তিতে দ্রুতই কিছু কাজ সেখানে করতে পারব।