শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উপকূলীয় উপজেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। চারদিকে নদী-খাল বেষ্টিত এই জনপদের প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। আর এই বনের এক অনন্য উপাদান কেওড়া গাছ ও তার ফল। আজকাল শুধু বনজ সম্পদ নয়, বরং স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে উপকূলবাসীর জন্য।
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, রমজাননগর, কৈখালী, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে নদীতীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য কেওড়াগাছ এখন বর্ষার মৌসুমে থোকা থোকা সবুজ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। দেখতে অনেকটা লটকন কিংবা ডুমুরের মতো হলেও এর স্বাদ টক, আর উপকারিতার তালিকা বিস্তৃত। স্থানীয়রা চিংড়ি বা ডালের সঙ্গে রান্না করে, কেউ আবার আচার, চাটনি বানিয়ে হাটবাজারে বিক্রি করেন। ঘরোয়া চিকিৎসায়ও কেওড়া ফল ব্যবহৃত হচ্ছে বদহজম, আমাশয় ও গ্যাস্ট্রিকের বিকল্প ওষুধ হিসেবে।
জানা গেছে, বনজ প্রাণীদের কাছেও এই ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। হরিণ, বানর ও বিভিন্ন পাখির প্রিয় এই ফলের মৌসুমে বনের প্রাণীকূলের আনাগোনা বাড়ে, জেগে ওঠে এক প্রাণবন্ত জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবনের ভারসাম্য রক্ষায় এই গাছের পরিবেশগত গুরুত্বও বিশাল। লবণাক্ত জমিতে বেড়ে ওঠা কেওড়া গাছ ভূমিক্ষয় রোধ করে, জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে দেয় প্রাকৃতিক বাঁধের কাজ। তার শ্বাসমূল সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে টিকে থেকে বাঁচিয়ে রাখে বাস্তুতন্ত্র।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কেওড়া গাছ বনের খাদ্যচক্র ও বাস্তুসংস্থানের জন্য অমূল্য। এর সুরক্ষায় সচেতনতা ও তদারকি বাড়াতে হবে।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলে ১২% শর্করা, ৪% প্রোটিন, ১.৫% ফ্যাট এবং প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংকসহ নানা উপকারী উপাদান যা ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
স্থানীয়ভাবে এর ফুল থেকে সংগ্রহ করা হয় বিখ্যাত সুন্দরবনের মধু, যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর। বাজারে বর্তমানে কেওড়া ফলের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা কেজি। কেউ কেউ কেওড়া থেকে আচার বানিয়ে বিক্রি করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। এমনকি মাছের খাদ্য হিসেবেও এর ব্যবহার বেড়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আবু কাওছার বলেন, “অনাবাদী উপকূলীয় জমিতে কেওড়া চাষ করলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুলবে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে কেওড়া হতে পারে একটি জাতীয় অর্থকরী ফসল।”
তবে এই সম্ভাবনার মাঝেও রয়েছে কিছু দুঃখজনক দিক। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া অপরিপক্ব ফল সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি। সচেতন মহল প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন।
বর্ষার শুরুতে ফুল, তারপর ফল; চৈত্র-বৈশাখে পরিপক্বতা আসে। আশ্বিন পর্যন্ত চলে সংগ্রহের মৌসুম। শ্বাসমূল, পাতা ও ছালও বহু রোগে ব্যবহৃত হচ্ছে বিকল্প ভেষজ উপাদান হিসেবে। কাঠ ব্যবহার হচ্ছে আসবাবপত্র ও ঘর নির্মাণে। দিন দিন দেশব্যাপী কেওড়া ফল ও গাছের পরিচিতি বাড়ছে, চাহিদাও ছড়িয়ে পড়ছে।
এই সব দিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপকূলীয় বাস্তবতায় কেওড়া গাছকে ঘিরে একটি পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উদ্যোগ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এর সুরক্ষা ও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কেওড়া হয়ে উঠতে পারে শ্যামনগরের সবুজ স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ার।