আল-হেলাল, নালিতাবাড়ি, শেরপুর : নানা প্রতিকুল অবস্থার মধ্য দিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার গারো পাহাড়ের ঢালে এখনো তিন হাজার বুনো পাহাড়ি উপজাতি পরিবার তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাথে বহুলাংশে মিল থাকলেও এরা মূলত ভিন্ন গোত্রের এক উপজাতি সম্প্রদায়। তবে মাল পাহাড়ি ও বুনো আলাদা নামের দুই সম্প্রদায় হলেও এরা একই গোত্রের ধর্ম কর্ম ও জীবনাচরণও অভিন্ন। ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা নালিতাবাড়ি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে পোড়াগাও, বুরুঙ্গা, কালাপানি, বারোমারি, বাতকোঁচি, চেংবের, গলাচিপা, খলচান্দা, নয়াবিল, গারোকোনা, পোঁড়াবাড়ি, হাতিপাগার, কালাকোমা, মৌকোড়া, চারআলি, পশ্চিম শমেশচুরা, কালিস্থান, পানিহাতা, তারানিপাহাড়, লক্ষীডুবা, বাঘবেড়, খলিশাকুড়া, হাতিবান্দা, মায়াঘাষি, তেলীখালি, ধাওধারা, কাটাবাড়ি, রামচন্দ্রকুড়া, ইউনিয়নের গ্রামগুলোতেই মূলত এদের বসবাস। স্বাধীনতা পূর্বকালে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বুনো ও পাহাড়ি উপজাতির বসবাস ছিল এতদঞ্চলে। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে অধিকাংশ পরিবার ভারতের নাগাল্যান্ড, মেঘালয় প্রদেশের গারো পাহাড় এলাকায় চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকেই আর জন্মভূমিতে ফিরে আসেনি। এখনো নালিতাবাড়ির ৬টি ইউনিয়নের ২৩ গ্রামে যে উপজাতি পরিবারগুলো তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অধিকাংশই ভূমিহীন কৃষিজীবী পরিবার। এরা গারোপাহাড়ের ঢালে পাহাড়ি আলু শিমুল আলু, লাল শিকড় আলু, হলুদ আলুর আবাদ করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে। এদের পুরুষ-মহিলা উভয়ের পেশা দিন মুজুরি। পুরুষের চেয়ে মেয়েরা বেশি পরিশ্রমি হলেও এরা সংখ্যালুঘু বলে শ্রম শোষনের শিখার হচ্ছে প্রতিনিয়তই। অশিক্ষা, কুসংস্কার ও সীমাহীন দরিদ্রে কাষাঘাতে এই উপজাতি জনগোষ্ঠি মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দুঃখজনক হলে সত্য যে, উপজাতি অদুষিত গ্রামগুলোতে স্বতন্ত্র কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। পর্যাপ্ত পানি সর্বরাহের জন্য সরকারি কোনো নলকুপ বসানো হয়নি গ্রামগুলোতে।

এমনকি স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্রিন স্থাপনেরও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে উপজাতি পরিবারগুলোর এখনো মাটির পাত কোয়ার পানি পান করছে এবং কাঁচা টয়লেট ব্যবহার করছে। এসব কারণে আদিবাশি গ্রামগুলোতে ডায়রিয়া, আমোশাসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। এছাড়াও উপজাতি গ্রামগুলোতে কিছু কিছু এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌছায়নি। এত কিছুর পরেও গারো ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায় ভুক্ত মাল পাহাড়ি ও বুনো উপজাতি সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো নানা সমস্যায়, মোকাবেলা করে এখনো তাদের আদিসংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে কোনো রকমে টিকে আছে। পূজা-পার্বন আর বিয়ের অনুষ্ঠান গুলো নাচ-গান, চুয়ালি মদপান আর শুকুরের মাংসের ভোজে মুখর হয়ে উঠে পাহাড়ি এই উপজাতি জনগোষ্ঠি। পাহাড়ি হাতির আক্রনের শিকার হচ্ছে এরা প্রতিনিয়তই।