মোঃ একরামুল হক, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের হালদা নদীতে আবারও ডিম ছেড়েছে কার্পজাতীয় মা মাছ। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ায় গত বৃহস্পতিবার (২৯ মে) দিবাগত রাত ২টার দিকে হাটহাজারীর মাদার্শা আমতুয়া অংশে পুরোদমে ডিম ছাড়ে মা মাছ। ডিম ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশিষ্ট হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. মো. শফিকুল ইসলাম।

তিনি জানান, রাত ২টার পর জোয়ারের সময় মা মাছগুলো একযোগে ডিম ছাড়ে। এরপর ডিম নদীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সংগ্রহ করেন শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী। অনেকে গড়ে ২ থেকে ২.৫ বালতি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছেন। শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত হালদার দুই পাড়ে ডিম সংগ্রহের কার্যক্রম চলে।

ডিম সংগ্রহকারী মো. শফি ও কামাল সওদাগর বলেন, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার আমরা কিছু নমুনা ডিম পেয়েছিলাম। এরপর থেকেই শতাধিক নৌকায় ডিম সংগ্রহকারীরা প্রস্তুত ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রসহ দমকা হাওয়া বইতে শুরু করলে হালদা নদীর পানি বাড়ে। এরপর রাত ২টার দিকে মা মাছ ডিম ছাড়ে।”

গবেষকরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন মাস হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে যদি বজ্রসহ বৃষ্টি হয় এবং পানির প্রবাহ বাড়ে, তখন ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এবারের পরিস্থিতিও ছিল অনুকূল এবং প্রকৃতি তার নিয়ম মেনেই হালদাকে উপহার দিলো প্রাকৃতিক প্রজননের এক অনন্য মুহূর্ত। ডিম সংগ্রহ করতে পেরে খুশি ডিম সংগ্রহকারীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন হ্যাচারিতে এবং মাটির তৈরি কুয়ায় ডিম ফুটানোর কাজে।

হালদা নদীতে বিগত বছরের ডিম সংগ্রহের পরিমাণ: ২০১৫ সাল: ২৮০০ কেজি, ২০১৬ সাল: ৭৩৫ কেজি, ২০১৭ সাল: ১৬৮০ কেজি, ২০১৮ সাল: ২২,৬৮০ কেজি, ২০১৯ সাল: ১০,০০০ কেজি, ২০২০ সাল: ২৫,৫৩৬ কেজি, ২০২১ সাল: ৬৫০০ কেজি, ২০২২ সাল: ৩০১০ কেজি, ২০২৩ সাল: ১৪,০০০ কেজি, ২০২৪ সাল: ১৬৮০ কেজি।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবি এম মশিউজ্জামান বলেন, অনেক উৎসাহ উদ্দীপনায় হালদায় ডিম সংগ্রহের উৎসব চলছে। গতবারের চেয়ে বেশি ডিম সংগৃহীত হবে আশা করছি। এখনো সংগৃহীত ডিমের মোট পরিমাণ হিসাব করা হয়নি।

এই ওঠানামা মূলত নির্ভর করে বৃষ্টিপাত, জোয়ার-ভাটা, পানির প্রবাহ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের উপর। ২০১৮ ও ২০২০ সাল ছিল সবচেয়ে সফল মৌসুম, যেখানে লক্ষাধিক মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন সম্ভব হয়েছিল।

হালদা নদী দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হিসেবে যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিবেশ রক্ষা, নদী দূষণ রোধ ও সচেতন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকরা।