একেএম আবদুর রহীম, ফেনী সংবাদদাতা : ফেনীর একমাত্র উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজী। ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে ফি বছর কাবু হয়, আবার ঘুরে দাঁড়ায় এই উপজেলার মানুষগুলো। এটাই তাদের নিয়তি।
ফেনী জেলাসহ এর পার্শ্ববর্তী জেলা কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নোয়াখালী জেলার সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ ও চট্রগ্রামের মিরেরসরাই উপজেলার সেচ সুবিধার লক্ষ্যে ছোট ফেনী নদীতে বাঁধ দিয়ে ১৯৮৬ সালে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৪০দরজা বিশিষ্ট ফেনী রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। যার ফলে বিশাল এলাকা সেচ সুবিধার আওতায় আসে। একই সাথে তখন থেকেই শুরু হয় সোনাগাজীর এতদাঞ্চলের নদী ভাঙ্গন। তখন বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে অত্র প্রতিবেদক বহুবার দৈনিক সংগ্রামে লিখেছিলেন যে, চট্রগ্রামের কিছু প্রভাবশালী মন্ত্রী এমপির যোগসাজশে ফেনী রেগুলেটর স্থাপন করা হয় কিছুটা কৌনিকভাবে। এতে এক ঢিলে অনেক পাখি মারার কুটকৌশল সফল হয়। নদী ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরতে থাকে। নদী যত পশ্চিমে সরে মিরেরসরাই উপজেলার পরিধি তত বাড়ে। কারণ নদীর মধ্য স্রোত দুই উপজেলার সীমানা। এক পর্যায়ে কিছুটা পশ্চিমে গিয়ে নদী উত্তরে রেগুলেটরের পেছনে চলে যায়। নদী পাড়ের মানুষের প্রধান জীবিকা প্রতিটি সম্পন্ন গৃহস্থের মহিষ ভেড়া ছাগলসহ বাড়িঘর,জমিজমা নদী গ্রাস করতে থাকে। তখন বিক্ষুব্ধ সোনাগাজীবাসী বাঁকা নদী সোজা করার জন্য মিছিল মিটিং মানববন্ধন ঘেরাও-এর মত আন্দোলন শুরু করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মরহুম মোঃ মোস্তফা, বিএনপির সভাপতি মরহুম মোঃ এছহাক (নেতা এসহাক), মরহুম কমান্ডার মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।
তখন এরশাদ ক্ষমতায়। আন্দোলনকারী নেতাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দৈনিক সংগ্রামের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট বরাবর কমান্ডার মোশাররফ হোসেনের নামে বিজ্ঞাপন আকারে একটি ‘আকুল আবেদন’ চার কলামে ছাপা হয়। (যদিও সে বিল কখনো পাওয়া যায়নি) অত্র প্রতিবেদক একটি রেখাচিত্রসহ কত সহজে এবং কম খরচে লোদির চরের মাঝ বরাবর খাল কেটে দিয়ে বাঁকা নদী স্থায়ীভাবে সোজা করা সম্ভব তার উপর এক বড় নিউজ করেন যা দৈনিক সংগ্রামের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয় (জেলা পাউবোর গোপন সহায়তায় তা করা সম্ভব হয়েছিল)।
তৎকালীন এমপি মরহুম মোশাররফ হোসেন সংগ্রামের ওই দুটি নিউজ (রেখাচিত্রেরটা এবং এরশাদের কাছে আবেদন) দেখিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখেন। সেদিন এই প্রতিবেদক, সোনাগাজীর কমান্ডার মোশাররফ হোসেন এবং বিএনপি নেতা এছহাক সাহেব তিনজন জাতীয় সংসদের দর্শক গ্যালারিতে ছিলেন। মরহুম মোঃ মোস্তফা ভাইও যাবার কথা ছিল। তিনি যেতে পারেননি। এমপি মোশাররফ হোসেন ‘পাশে’র ব্যবস্থা করেছিলেন। কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। ১৯৮৮-৮৯ সালে একবার অত্র প্রতিবেদকের দশ পর্বের সিরিজ নিউজ ছাপা হয় সংগ্রামের প্রথম পৃষ্ঠায়। তার দুইটার শিরোনাম ছিল এরকম “এ যেন সোনার ডিম পাড়া হাঁস” “বাঁধ নির্মাণই করা হয় ভেঙে যাবার জন্য”। তখন একদিকে বাঁকা নদী সোজা করার আন্দোলন তুঙ্গে চলছে অপরদিকে পাউবো ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে রেগুলেটরের পশ্চিমের উইং ডাইক ভেঙে তছনছ করে নদী উত্তরে রেগুলেটরের পেছনে ঢুকে গেছে সেখানে রিং বাঁধ দেয়া হচ্ছে। কারণ ভাঙনের কারণে মূল রেগুলেটর হুমকির মুখে পড়ে। খবর পেলাম যে সেখানে ভাঙন রোধের নামে যেসকল বালি, মাটির বস্তা, বোল্ডার ফেলা হচ্ছে তাতে বিরাট ঘাপলা চলছে। প্রতিবেদক নিরীহ পাবলিকের মত ঘটনা প্রত্যক্ষ করে দেখেন সত্যি ১০ট্রাক বালি ফেলে লেখা হচ্ছে ১০০ট্রাক, ১০০ পিচ বোল্ডার ফেলে লেখা হচ্ছে ১০০০পিচ। কারণ নদীতে ঢেলে দিলেই প্রমাণ বিলীন। সোনাগাজী এসে জানানোর পর বহু মানুষ সেখানে হাজির হয়। পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা কোন রকমে পালিয়ে বাঁচে। ক্ষুব্ধ জনতা ঠিকাদারের ট্রাক ঠেলে নদীতে ফেলে দেয়।
আজ ভাবলে অবাক লাগে যা গত বুধবার একটা টকশোতে তিনি বলেওছেন যে প্রায় ৪০ বছর পরেও আজো সেই একই দৃশ্য, একই নাটক, একইভাবে চলছে হরিলুট। শুধু পাত্রপাত্রী পরিবর্তন হয়েছে।
কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি লেখা আসে। সেখানে এক বিসিএস পাস করা যুবক বলছে,পাউবোতে চাকরি করবে, কারন এখানে কোন কাজ করতে হয়না,অল্প দিনেই কোটিকোটি টাকা কামানোর অবারিত সুযোগ আছে।
এখন ফেনীর মানুষ বন্যা কবলিত। প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা, রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী, বিজিবি, রেড ক্রিসেন্ট সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়েছে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায়।ত্রান উপদেষ্টা, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সহ আরো অনেকে এসেছেন এবং আসবেন। কিন্তু তাঁরা যেখানেই যাচ্ছেন দূর্গত মানুষরা বলছেন আমাদের ত্রান লাগবেনা, স্থায়ী বাঁধ দিন যেন আমরা বাঁচতে পারি।
গত বছরের বন্যায় তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সে ধকল কাটিয়ে উঠার আগেই আবার অতিবৃষ্টি ও ভারতের পানিতে সব সয়লাব। এর থেকে বাঁচার একটিই পথ। বন্যা নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ ও অবাধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং করা এবং সকল দখল হওয়া, মজে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করা।
আজ সময় এসেছে দেশের দুর্গতির জন্য দায়ীদের হিসাব নেয়ার। চাকরিতে ঢুকতে সম্পদের হিসাব দিয়ে ঢুকবে, প্রতি বছর সে হিসাব রিনিউ করবে। যারা আগে এসব বিভাগে কাজ করেছে, তাদের হিসাব নেয়া দরকার, যারা এখন আছে তাদেরতো নিতেই হবে? যদি আদায় করা নাও যায় তার আপনজনেরা জানুক সে একজন চোর, ঘৃণা করুক তাকে!
আজ সোনাগাজী, ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়ায় একই চিত্র। বাঁধ স্থায়ীভাবে টেকসই পদ্ধতিতে নির্মাণ করবে না। যদি বাঁধ না ভাঙে তাহলে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরি নিয়ে কি লাভ? আমরা কি কোনদিন পাবো সেরকম জনবান্ধব সরকার যারা নিজেরা সৎ থাকবে, তাদের অধীনস্তদের সৎ রাখতে কঠোর হবে?