চারঘাট (রাজশাহী) সংবাদদাতা : রাজশাহীর সীমান্তবর্তী চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় নতুন দুই ধরনের ভারতীয় কাশির সিরাপ CHOCO ও Escaf (Laborate Codeine Syrup) দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে সীমান্ত অঞ্চলে এই দুই সিরাপ এখন বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নতুন করে যুবসমাজকে আসক্তির গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিরাপগুলোতে রয়েছে Codeine Phosphate—যা ফেনসিডিলের মতোই নেশাসৃষ্টিকারী ও আসক্তিকর উপাদান।
CHOCO Cough Syrup-এ আছে Codeine Phosphate + Triprolidine Hydrochloride, আর Escaf-এ আছে Codeine Phosphate + Chlorpheniramine Maleate + Ammonium Chloride।
উভয় সিরাপই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এটি স্পষ্টতই অপরাধ হিসেবে গণ্য।
ফেনসিডিলের বোতল এখন বাজারে ৪,০০০–৪,৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও, ভারতীয় এই নতুন সিরাপগুলো পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১,২০০–১,৫০০ টাকায়।
ফলে তরুণরা সহজলভ্য এই বিকল্পে ঝুঁকছে দ্রুত। চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর এলাকায় কথা হয় দুই তরুণ মাদকসেবীর সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারা বলেন, ফেনসিডিল এখন অনেক দাম, আমাদের পক্ষে খাওয়া সম্ভব না। এখন আমরা CHOCO আর Escaf খাই। এগুলো ফেনসিডিলের মতোই নেশা দেয়, দামও কম।
এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, সীমান্ত এলাকায় নতুন ভারতীয় সিরাপগুলো কীভাবে “সহজ বিকল্প” হিসেবে তরুণদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাচারকারীরা এখন নদীপথ ব্যবহার করছে। ইউসুফপুরের কার্ডধারী জেলে সাহাবুদ্দিন আলী বলেন, অনেকে মাছ ধরার নাম করে নৌকা নিয়ে যায়। মাঝনদীতে ভারতীয় নৌকা এসে সিরাপের বোতল তুলে দেয়। পরে তীরে এনে বিক্রি করে দেয়।
ভাঙারি ব্যবসায়ী আজিবর আলী বলেন, আগে প্রতি মাসে দশ বস্তা ফেনসিডিলের খালি বোতল কিনতাম। এখন তার জায়গায় ‘CHOCO’ আর ‘Escaf’ লেখা বোতল বেশি পাওয়া যাচ্ছে। জানলাম এগুলোই এখনকার নতুন নেশার জিনিস।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চারঘাট ইউসুফপুর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার সুলাইমান বলেন, ফেনসিডিলের বড় চালান না আসায় আমরা অনুসন্ধান চালাই। জানতে পারি ভারতীয় কাশির সিরাপ CHOCO ও Escaf দেশে প্রবেশ করছে। গত ২৬ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালালে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। আমরা ১০২ বোতল CHOCO সিরাপ উদ্ধার করে চারঘাট মডেল থানায় জমা দিয়েছি।
চারঘাট-বাঘা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খালেদ হোসেন বলেন, ফেনসিডিল উদ্ধার এখন অনেকটাই কমে গেছে, কারণ মাদক কারবারিরা এখন ভারতীয় CHOCO ও Escaf সিরাপকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে অভিযান অব্যাহত আছে।
চারঘাট ও বাঘা উপজেলার সীমান্তবর্তী শাহাপুর, টাংগোন, ইউসুফপুর, মোক্তারপুর, নতুনপাড়া, কুঠিপাড়া, গোপালপুর, চন্দন শহর, পিরোজপুর, রাউথা, মীরগঞ্জ, কেশবপুর, আলাইপুর, পানিকামড়া, নারায়নপুর ও ব্যাঙ্গারি এলাকায় এই নতুন মাদক সিরাপগুলোর বিস্তার ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ—এইসব এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মাঝনদীর জেলেরা পাচারে সরাসরি জড়িত।
চারঘাট উপজেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুরাদ পাশা বলেন, ফেনসিডিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভেবেছিলাম যুবসমাজ হয়তো নেশা থেকে সরে আসবে। কিন্তু এখন তারা নতুন ভারতীয় কাশির সিরাপের দিকে ঝুঁকছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজকেও এখন আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহী (সার্কেল-খ) এর পরিদর্শক সাইফুল আলম জানান, সম্প্রতি ‘CHOCO’ ও ‘Escaf’ নামে নতুন ভারতীয় মাদক সিরাপ বাজারে এসেছে। এতে কোডিন থাকায় এটি অত্যন্ত নেশাসৃষ্টিকারী। আমরা ইতোমধ্যে কঠোর নজরদারি ও অভিযানে নেমেছি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়—পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মাদক প্রতিরোধ সম্ভব নয়। সীমান্তে নজরদারি জোরদার না করলে এবং যুবসমাজের মানসিক সচেতনতা না বাড়ালে “কাশির সিরাপ” নামের এই নতুন মাদক তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে।