সময় কখনো কখনো এমনভাবে থমকে দাঁড়ায়, যেখানে শব্দও হারিয়ে যায়। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের ধামলই গ্রামে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে সবাই-যেখানে একই দিনে, মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন বাবা ও ছেলে।

রবিবার (৩ আগস্ট) সকালটা ছিল অন্য অনেক দিনের মতোই সাধারণ। কিন্তু ধামলই গ্রামের দলিল লেখক হাসমত আলীর (৭৫) পরিবারে সে সকালই বয়ে আনে এক ভয়াবহ ঝড়। বার্ধক্যজনিত দীর্ঘ অসুস্থতার পর সকাল ১০টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রিয় ছেলে বাবুল (৪৫), যিনি নিজেও দলিল লেখক হিসেবে কাজ করতেন, বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

শোক সামলাতে না পেরে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বুকের মধ্যে ব্যথা শুরু হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি-ডাক্তার জানান, বাবুল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের দুই সদস্যের এই মৃত্যু যেন রক্তমাংসের মানুষদেরও পাথরে পরিণত করেছে।

যে ভালোবাসা হৃদয় থামিয়ে দেয়:

এই গল্প কেবল মৃত্যুর নয়, অগাধ ভালোবাসারও। বাবুল তার বাবার প্রতি ছিলেন চরম শ্রদ্ধাশীল ও আবেগপূর্ণ। বাবার দীর্ঘ অসুস্থতা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। বাবার চলে যাওয়ার খবর যেন মুহূর্তেই ভেঙে দিল তার অন্তর, থামিয়ে দিল হৃদয়।

এ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-ভালোবাসা কেবল বেঁচে থাকার অনুভূতি নয়, তা প্রয়োজনে মৃত্যুর সাথেও পথ হাঁটে। বাবুল যেন বাবাকে একা যেতে দিলেন না। হয়তো ভেতরে ভেতরে বলেছিলেন, “চলো বাবা, একসাথেই যাই…”

একসাথে ঘুমিয়ে থাকা দুটি জীবন:

স্থানীয়রা জানান, “দুজনেই অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন। দলিল লেখক হিসেবে এলাকার অনেক মানুষের সেবা করেছেন। আজ তারা পাশাপাশি দুটি কবরে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকবেন।”

ধামলই গ্রামে এখন যেন নীরবতা নামা এক বিকেল। দুই প্রজন্মের দুটি জীবন একসাথে শেষ হয়েছে, রেখে গেছে এক বুক শূন্যতা, কিছু না বলা কথা, আর অশ্রুসিক্ত স্মৃতি।

আমরা যখন আমাদের চারপাশে প্রতিদিন শত ঘটনা দেখি, তখন কিছু কিছু গল্প আমাদের থামিয়ে দেয়। এই বাবা-ছেলের গল্প তেমনই এক স্মৃতির প্রতিচ্ছবি-যেখানে ভালোবাসা কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, জীবন ও মৃত্যুর মাঝেও সে সেতু গড়ে তোলে।

হাসমত আলী ও বাবুল-আপনারা শান্তিতে ঘুমান। আপনাদের গল্প থাকবে আমাদের মনের গভীরে, আমাদের হৃদয়ের পাতায়।