আল-হেলাল (নালিতাবাড়ি), শেরপুর সংবাদদাতা : ১৯৭১ সালের দেশ স্বাধীনের পর দশগাঁয়ের মানুষ এসে বসতি গড়ে ঘাঁকপাড়া ঘাটে। লোক সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি। ঘাটের পুরনো বট গাছটিও আজ আর নেই। ঘাঁকপাড়া বাজারে আশ-পাশে ছিলো ৫টি বট পাকুড়ের গাছ, তাও নেই। প্রকৃতির স্মৃতিচিহ্নগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। সামনেই দূরন্তÍ ভোগাইও ধেয়ে আসছে, কোনো বাঁধ ও বাঁধাই মানছে না। শুকনো, শীত মৌসুমের প্রীতিকর পাহাড়ি ভোগাইনদী বর্ষায় হয়ে উঠে ভীতিকর। তখন খরস্রোতা ভোগাইয়ের মুখে হাসি এবং আনন্দের নাচশুরু। ভরা বর্ষার এ নাচ পাহাড়ি প্রলয়ের। লন্ডভন্ড করে দেয় নদীতীর, মানুষের বসতভিটা। এবারের বর্ষাতেও সেই চিহ্ন রেখে গেছে। দুরন্ত ভোগাইনদী কিছুটা এগিয়েও এসেছে। গত দশ বছর ধরেই নদী ধেয়ে আসছে পশ্চিমের দিকে। ঘাঁকপাড়া ঘাটের মাঝি বাবুল হাতের ইশারায় দূরের নদীকে দেখিয়ে বললেন, সেখানেও ছিল গ্রাম, আজ শুধু নদী। এমনই কত গ্রাম আজ দূরন্তÍ নদী ভোগাই এর বুকে। ওই সবগ্রামের মানুষদেরই এখন ঠিকানা ঘাঁকপাড়া ও নয়াবিল ঘাটে। নদী ভাঙনে হারিয়ে যাওয়া গ্রামগুলোর নাম বেঁচে আছে এই মানুষদের মুখে। শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার নয়াবিল বাজারের পূর্ব পাশে ভোগাই নদীর তীরের ঘাঁকপাড়া ঘাঁটে গেলে দেখা মিলবে তাদের। কেউ বাস করছে জীর্ণ কুটিরে, কেউ টিনের চালায়, খড়ের ঘরে। কেউ যৌবনে এসে আজ বৃদ্ধ কেউ কৈশোরে এসে আজ তারুণ্যে। নালিতাবাড়ি উপজেলা সদর হতে প্রায় ১৪ কি.মি. দূরের গ্রাম ঘাঁকপাড়া। পাকা সড়কের অনেকটাজুড়ে এখন এবড়োখেবড়ো। প্রতি বছর বন্যা এসে পথ ঘাটের ক্ষয় ধরিয়ে দেয়। ঠিক হয়, ফের পাহাড়ি নদী ফুলে উঠে। ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। পাহাড়ি নদীর এ খেলা চলছে নিরন্তর। এর সঙ্গেই ঘর বেঁধে আছে মানুষ বছরের পর বছর। ঘাঁকপাড়া ও নয়াবিল গারোপাহাড়ের দুটি ইউনিয়ন। ১৬টি গ্রাম তার একদা এইসব গ্রামের লোকছিল পরমানন্দে। আজ যে আনন্দ নেই তাও নয়। তবে ভাঙ্গন কবলিত মানুষ এসে ভিড় করায় সে আনন্দে কিছুটা তো ভাটা পড়েছেই। এর মধ্যেও নদী ভাঙ্গা মানুষদের আশ্রয় দেয়ার আনন্দটি তাদের কাছে বড়। এরা সবাই অস্তিত্বের জন্য লড়াই করে চলেছে। কেউ করেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কেউ জমি বর্গা নিয়ে ফলাচ্ছে ফসল। কেউ করছে দিন মজুরি। এর মধ্যেই লেখাপড়া করছে তারা। নয়াবিল ও ঘাঁকপাড়া গ্রামে শিক্ষিতের হারও বেশি। ভাঙ্গনের থাবায় পড়া শিশুমনে জেগে উঠে লেখাপড়া করেই তাদের বাঁচতে হবে, আর এ দীক্ষা দেয় তাদের অভিভাবকরা। গ্রামের একজন কৃষক বিশেষ করে যাদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে নদী তারা সন্তানদের বাধ্যতা মূলক স্কুলে পাঠায়। যে কারণে নারী শিক্ষিকার হারও বেশি। গ্রামের পশ্চিম পাড়ে নয়াবিল বাজারের কাছেই স্থাপিত হয়েছে গার্লস স্কুল অনেক আগে। গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, দাখিল মাদরাসা, কওমী মাদরাসাও আছে। ফসলের মৌসুমে কৃষক যে যার অবস্থান থেকে নানা ধরনের ফসল ফলায়। গারো কোনা গ্রামের সত্তরোর্ধ বয়সী গৃহস্ত রফিজ উদ্দিন ব্যাপারী সেই দিনগুলোর স্মৃতির পাতা মেললেন। আমন আবাদ ঘরে ওঠার পর নবান্নের উৎসব শুরু হতো জ্যোৎস্না রাতে ভোগাইয়ের মাঝ নদীতে গিয়ে। বড় নৌকায় চেপে ঢাকঢোলের বাদ্য বাজিয়ে সেকি আনন্দ। ঢাকের বাদ্য শুনে জেগে উঠতো নদী তীরের গ্রামের লোক। তারাও শরিক হতো নৌকা নিয়ে। গ্রামের গৃহস্তরা আয়োজন করতো এই অনুষ্ঠানের। সেই গৃহস্তদের অনেকেই এখন আশ্রিত। কেউ বাঁধে কেউ ঘাঁকপাড়া গাঁয়ে গ্রামগুলোকে গিলে খেয়েছে রাক্ষসী দূরন্ত ভোগাই। ভোগাইকে বশ করতে পারছে না কেউ। ভোগাই শুধু তেড়েই আসছে। সত্যিই কি ভোগাইকে বশ করা যাচ্ছে না। পাহাড়ি নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে কতই না পরিকল্পনা করা হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের কতই না স্থাপনা দেখেছে এলাকার মানুষ। কিছুই টিকছে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ভোগাই এর ভয়াল থাবার কাছে সবাই অসহায়। কখনও গ্রাম গিলে খাচ্ছে, কখনও জেগে থাকা জমিতে বালি ফেলে বালিয়াড়ি করে দিচ্ছে। ঢলে আসা এই বালি ঢুকে পড়েছে বাড়িঘরেও। ঘাঁকপাড়া বাজারে নিকট একদিকে ফসলী জমি হয়ে যাচ্ছে নদী, আরেক দিকে টিকে থাকা জমি হয়ে পড়েছে বালিয়াড়ি। কাছাকাছি গ্রামগুলোর নিস্তার নেই। নয়াবিল গ্রামের উজানে এবং কিছু ভাটিতে প্রভাব শালীরা অবৈধভাবে নদী থেকে বালি উত্তোলনের কারণে বেশির ভাগ জমিই বালিয়াড়ি হয়ে এখন অনাবাদী। গ্রামের লোক বার বার প্রশাসনের দারস্ত হয়ে অভিযোগে দিনের বেলায় বালু তোলা বন্ধ হলেও গভীর রাতে নদী থেকে বালি উত্তোলন করা হয়। নিস্ফলা জমি ব্যর্থই করে দেয় শুধু। তবুও আশায় থাকে তারা, ফের পলি পড়ে উর্বরা করে দেবে এই জমি। আশায় বুক বেঁধে থাকা মানুষের দিন আর ফুরোয় না। নয়াবিল ভোগাই নদীপাড় গ্রামের বিল্লাল হোসেনের বয়স এখন ৬৫ পেরিয়েছে। টিনের চালারবাড়ি আঙ্গিনাও বেশ বড়। গৃহস্ত বাড়ির এই আঙ্গিনায় একটা সময় কামলা যে ভরা থাকতো তা বোঝা যায়। খুলির (বহিআঙ্গিনা) কোনায় বেড়ার বড় ঘর আধাভাঙ্গা, কতদিন ঠিক করা হয়নি। সেও একজন কাঁঠ মিস্ত্রী। ভিতরের কাঠের চৌকাগুলো ভেঙ্গে নড়বড়ে। মাকড়সা জাল বেঁধেছে, বাদুর উড়ে এসেছে, ইঁদুর ব্যাঙ বাসা বেঁধেছে। একদা যে ঘরে কামলা কিষানে সরব থাকতো, তা প্রায় নীরব নিথর। এখন যে কামলারা আসে তা সংখ্যায় অনেক কম। অর্ধেকেরও কমে নেমে গিয়েছে। গৃহস্তদের জমিজিরাত কিছু খেয়েছে প্রমতা ভোগাই, কিছু অনাবাদী রয়েছে বালিয়াড়ির জন্য। উপজেলার অনেকেরই আজ এই অবস্থা। বান্দের বাজারে গিয়ে শোনা যায় কতো কাহিনী-একদার বড় গৃহস্ত যার ছিল অনেক জমিজিরাত, সে এখন বাঁধের উপর ঝকি ঝুপরি ঘরে বাস করছে। পরিবারে সদস্যদের কেউ এলাকা ছেড়েছে। কে কোথায় গেছে তা জানাও যায় না। নালিাতাবড়ি উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া মন্ডলিয়াপাড়া ও নয়াবিল ইউনিয়নের বুক চিরে পাহাড়ি খরস্রতা দূরন্ত নদী ভোগাই। নদীর ঘাঁকপাড়া ঘাঁটে কোনো সেতু না থাকায় সরাসরি স্থলবন্দর নালিতাবাড়ি শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যবসা বানিজ্য ও জনগনের চলাচলে নাজুক অবস্থা। নদীতে নৌকা পথে পারাপার অথবা ৫/৭ মাইল ঘুরে ব্যবসা বানিজ্যে চলাচলে জনগনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। উপজেলার দুঁটি ইউনিয়নে রামচন্দ্রকুড়া মন্ডলিয়াপাড়া, চান্দ্রেনূন্নী, চিনামারা, গারোকুনা, কালাকুমা, হাতিপাগার, চারআলী, নয়াবিল, ঘাঁকপাড়া গ্রামের প্রায় ২ হাজার চাষীর সৃজনাল ব্যবসা, গরুসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। এখান থেকে নয়াবিল বাজার সংলগ্ন নয়াবিল উচ্চবিদ্যালয়, গার্লস স্কুল, কওমী মহিলা মাদরাসা, ঘাঁকপাড়া দাখিল মাদরাসা, ভূমি অফিস ও সরকারি প্রাইপারি স্কুল সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থলবন্দর বাজার যেতে ১০ মিনিটের রাস্তা মেটো রাস্তা দিয়ে ৭ কি.মি. ঘুরে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড়-দুই ঘন্টা। অপর দিকে দাওধারা, কাটাবাড়ি, বারোমারি, শিমুলতলা, জাঙ্গালীয়াকান্দা, হাতিপাগারসহ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে রিক্সা ভ্যান যোগে একইভাবে ঘুরে আসতে হয় একসময়ের ঐত্যিবাহী ঘাঁকপাড়া গরুর হাটে। বিশেষ করে গরু ব্যবসায়ী কিংবা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিগণ বেশী ভোগান্তিতে পড়েন। এলাকার মানুষের দাবি উন্নয়নের রোড ম্যাপ হিসেবে প্রমত্তা পাহাড়ি নদীর ঘাঁকপাড়া ঘাটে একটি ব্রিজ নির্মাণে সময়ের দাবি।
গ্রাম-গঞ্জ-শহর
নালিতাবাড়ি ঘাঁকপাড়া ঘাটের কথা
ভোগাই নদীর উপরে সেতু নির্মাণ সময়ের দাবি
১৯৭১ সালের দেশ স্বাধীনের পর দশগাঁয়ের মানুষ এসে বসতি গড়ে ঘাঁকপাড়া ঘাটে। লোক সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি। ঘাটের পুরনো বট গাছটিও আজ আর নেই। ঘাঁকপাড়া বাজারে আশ-পাশে ছিলো ৫টি বট পাকুড়ের গাছ, তাও নেই। প্রকৃতির স্মৃতিচিহ্নগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।
Printed Edition