কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) সংবাদদাতা : পর্যটক প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ পর্যটন নামে খ্যাত কাপ্তাই। এখানে রয়েছে পাহাড়, গিরি ঝরনা, নদী ও হ্রদ সহ অপরূপ সৌন্দর্যের নীলাভূমি।
কর্ণফুলী নদীর শেষ প্রান্তের কিনারা ঘেঁষে দখল করা ভূমিতে গড়ে উঠছে অবৈধ ভবনের সারি। ঝুঁকিপূর্ণ এসব অবৈধ ভবনে বসবাসকারী মানুষেরা বাস করছেন মৃত্যুর আশঙ্কায়। রূপ হারাচ্ছে প্রকৃতি। যত্রতত্র পর্যটন স্পট গড়ে তোলার নামে দখল বাণিজ্য চলায় স্বার্থান্বেষী একটি মহল। এতে করে স্থানীয় মানুষের বসবাস ও পর্যটকদের বেড়ানোর স্থানগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি ছাড়া মনগড়া নিয়মে পাহাড় কাটা, সড়কের তলদেশ কাটা, নদী ও হ্রদের কিনারায় পাকা দালাল নির্মাণ করে পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করার অপচেষ্টার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে কাপ্তাই চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক ও কর্ণফুলী নদীর কিনারা সমূহ। তথ্যে আরো জানা গেছে, পাহাড়ের কিছু অংশ বাদে ব্যাপকভাবে বেদখল হয়েছে কর্ণফুলী নদীর পাড়গুলো । রাঙামাটি জেলার কাপ্তাইয়ের এমন কোনও স্থান নেই যেখানে দখল হয়নি পাহাড়, নদী, ঝিরি-ঝর্ণার অংশ বিশেষ । সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে কর্ণফুলী পাড়, কাপ্তাই হ্রদের আশ-পাশ ও ঘনবসতিপূর্ণ শিলছড়ি এলাকায়।
জানা যায়, সরকারি প্রজ্ঞাপণ অনুসারে, কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফুলী নদীর ১২০ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) এর মধ্যে কোনও ভবন নির্মাণ করার অনুমতি নেই। কাপ্তাই হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল। ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ার ভাটা মিলে ধারণ ক্ষমতা ১১০ এমএলএস কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রজ্ঞাপণের তোয়াক্কা না করে নদী ও হ্রদের পানির সীমানার ভেতরেই পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার নামে বিভিন্ন পাকা স্থাপনা গড়ে তুলছেন এসব ভবনের বেশিরভাগই কর্ণফুলী নদীর কিনারা ও কাপ্তাই হ্রদের ওপর অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলে ওই সব স্থান সমূহের স্থাপনা গুলো খুঁটি থেকে মাটি সরে গিয়ে ভবন ধসের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি নদী ও হ্রদের প্রকৃত গতিপথ প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এক কথায় কাপ্তাইতে নদী শাসন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর চলছে সরকারি খাস জায়গার দখল শর্তের বেচা কেনার হিড়িক।
স্থানীয়রা জানান, এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে তারা এসব স্থানে বাস করছেন।
তুহিন আরও বলেন, ‘তাহলে আমরা স্বল্প আয়ের লোকেরা কোথায় যাব? ঝুকিপূর্ণ হলেও আমাদের এখানের থাকতে হবে। মূল শহরের বাসাগুলোর ভাড়া যদি আমাদের আয়ের মধ্যে থাকতো তাহলে কখনও আমরা এখানে থাকতাম না।
পরিবেশবাদীরা বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী স্থানগুলো যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে, তাতে রাঙামাটিকে আর পর্যটন এলাকা হিসেবে মনে করা যায় না। অপরিকল্পিতভাবে দখলয়ানের ফলে যেকোনও সময় এখানে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম এর স্বাক্ষরিত একপত্র বলা হয়েছে,
যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত পর্যটন ও বানিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ হতে বিরত থাকার বিষয়ে,
পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (ইহার উপর আনীত সকল সংশোধনীসহ) এর ২২ ধারার আলোকে প্রণীত প্রথম তফসীলের ক্রমিক ২৮ অনুযায়ি স্থানীয় পর্যটন পার্বত্য জেলা পরিষদের একটি তফসীলভূক্ত কার্য। ইতোমধ্যে স্থানীয় পর্যটন সংক্রান্ত কার্যাদি পরিষদ আইন অনুসারে সরকার পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তরও করেছে।কিন্তু, ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অন্যান্য স্থান সহ কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে অপরিকল্পিভাবে বানিজ্যিক ভবন/পর্যটনস্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। এতে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (ইহার উপর আনীত সকল সংশোধনীসহ) লঙ্ঘিত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং অগ্নিদুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় হতেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সাজেকসহ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই হ্রদ ও কর্ণফুলী নদীর নিকটবর্তী অধিক্ষেত্রে সকল জায়গায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য পরিষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোন বানিজ্যিক ভবন/স্থাপনা নির্মাণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি নির্দেশনা জারি করেছেন বলে নিশ্চিত করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয় এর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সময় সংবাদ কে বলেন , জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ কর্তৃক রাঙ্গামটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলাধীন কাপ্তাই লেক ও কর্ণফুলী নদী সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, কতিপয় শর্তান্বেষী মহল পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ব্যতীত কর্ণফুলী নদীর জমি দখল করে রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন। এরুপ কর্মকান্ডের দ্বারা প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুসারে দন্ডনীয় অপরাধ। সংক্রান্ত বিষয়ে যারা নদী দখল করে রিসোর্ট নির্মাণ করার সাথে যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে একাধীক ব্যক্তিকে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) অনুসারে এ নোটিশ জারী করা হয়েছে। এদিকে সোমবার কাপ্তাই উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় পর্যটন স্পট গুলো পরিবেশবান্ধব যাতে হয় সে বিষয়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়, এ ব্যাপারে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন তার বক্তব্যে বলেন, দখলদারদের কবল থেকে নদী রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য নিয়ে সকলকে আন্তরিক হয়ে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করতে হবে, পরিবেশ ও প্রতিবেশীকে সুরক্ষা দিতে হলে প্রথম কাজ হবে কর্ণফুলী নদী রক্ষা করা। যারা নদী দখল করে আছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে সভায় অবহিত করে এ-ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।