- জাপানের সাথে নতুন চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব দ্রুত ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে
- তুরস্ক সফর হতে যাচ্ছে ঢাকার সামরিক কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়
চলমান বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে যখন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব টানাপোড়েন ও ক্ষমতার পুনর্মূল্যায়ন চলছে, ঠিক তখনই নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান ও অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে আগামী আগস্টে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান এবং অক্টোবরে ইউরোপীয় শক্তি তুরস্ক সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা যায়। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর দুটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অক্টোবরের তুরস্ক সফরটি হতে যাচ্ছে ঢাকার সামরিক কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়। আর জাপানের সাথে নতুন চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব দ্রুত ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আসন্ন এই দুই ঐতিহাসিক সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির এক বড় পরীক্ষা ও কৌশলগত বাস্তবায়ন। বঙ্গোপসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সফরসূচিতে (২০২৬) রয়েছে জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি, মাতারবাড়ী ও মেগা অবকাঠামো, ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা শিল্প, ড্রোন কারখানা, বাণিজ্য ও ইসলামিক বিশ্বের যৌথ সম্পর্ক ও যৌথ কমিটির মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক কিভাবে আরও বেগবান করা যায় তা নিয়ে সফরে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্র অনুযায়ী, চলমান জুলাইয়ের শুরুতে জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকির নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জাপান সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। এর পর থেকেই দুদেশের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর মাঝে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক সফরে যাওয়ার প্রকট সম্ভাবনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এবং ওই সফরের ফাঁকে ইউরোপের এক বা একাধিক দেশে দ্বিপাক্ষিক সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এরপর অক্টোবরে তুরস্ক সফর করবেন তিনি, যা ইতোমধ্যে দুপক্ষের সম্মতিতে চূড়ান্ত হয়েছে।
সূত্র জানায়, জাপান হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শর্তহীন উন্নয়ন সহযোগী। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় বাংলাদেশ কেবল ‘উন্নয়ন সহায়তা’ বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বে যেতে চায়। স্বল্পোন্নত দেশের এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাপানি মূলধন, বিশাল বাজার এবং তাদের বিশ্বমানের প্রযুক্তির বিকল্প নেই। আর তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে চায়। একক কোনো পরাশক্তির ওপর প্রতিরক্ষা খাতে নির্ভর না করে তুরস্কের মতো উদীয়মান সামরিক শক্তি থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা ঢাকার অন্যতম মূল লক্ষ্য।
পররাষ্ট্র ও সরকারের অন্যান সূত্রে জানাযায়, জাপান সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ)। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। বিশ্বজুড়ে যখন সংরক্ষণবাদী অর্থনৈতিক নীতি বা বাণিজ্যে নানা বাধা তৈরির প্রাচীর গড়ে উঠছে, তখন এই চুক্তি বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করছে। এই চুক্তির ফলে জাপানের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৪০০টি পণ্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। জাপানের সঙ্গে এই চুক্তি ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে, যার বিপরীতে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে ১.৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। নতুন চুক্তির ফলে এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব দ্রুত ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্রে আরও জানায়, জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত এইচ ই সাইদা শিনিচি সম্প্রতি এক জরিপ উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, নির্বাচিত সরকার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকায় জাপানি কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই আগামী ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর সফরে যেসব মেগা প্রকল্প পর্যালোচনা ও নতুন অর্থায়নের রূপরেখা নির্ধারিত হবে। মাতারবাড়ী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান লজিস্টিক হাব হতে যাওয়া এই গভীর সমুদ্রবন্দর বঙ্গোপসাগরের সার্বিক বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। ১২০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রও জাপানের বাংলাদেশে বড় প্রকল্পগুলোর একটি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর এই বিশ্বমানের টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প ও যমুনা রেলওয়ে সেতুসহ ঢাকার যানজট নিরসন ও অভ্যন্তরীণ সংযোগে এই অবকাঠামোসমূহ মূল ভূমিকা রাখছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও এবার জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় উন্মোচন ঘটছে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে গত ২১ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসমর্থন ও অনুমোদন করা হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আসন্ন সফরটি হবে এই সামরিক চুক্তি বাস্তবায়নের মূল প্ল্যাটফর্ম। জাপানি রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচির মতে, প্রতিরক্ষা চুক্তিটি যেন মসৃণভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে বিষয়ে দুই দেশই একমত। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক নজরদারি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় টোকিও থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম লাভ করবে বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অক্টোবরের তুরস্ক সফরটি হতে যাচ্ছে ঢাকার সামরিক কূটনীতির এক নতুন অধ্যায়। জুন মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আঙ্কারার কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে সামরিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের বিষয়টি সরকারের নীতিগত আলোচনার মধ্যে রয়েছে। তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। তুরস্কের তৈরি বাইরাকতার ড্রোন, আধুনিক সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আধুনিক কামানের প্রযুক্তি হস্তান্তরে চুক্তি হতে পারে। ওআইসি এবং ডি-৮ ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মেলবন্ধন জোরদার করা এবং প্রযুক্তি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তুর্কি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান ও তুরস্ক সফর বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি বলেন, “নতুন সরকারের কূটনৈতিক দর্শনের মূলভিত্তি হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। আমাদের এই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সফরগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো; কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ব্লকে না গিয়ে নিজেদের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রতিরক্ষা খাতকে স্বাবলম্বী করা। জাপান ও তুরস্ক সফর বিষয়ে যথাসময়ে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হকের মতে, ‘‘অতীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই একক বা দ্বিমুখী আঞ্চলিক নির্ভরতার মধ্যে বন্দি ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান ও তুরস্ক সফর প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে প্রবেশ করছে। জাপান আমাদের অর্থ ও অবকাঠামো দেবে, আর তুরস্ক দেবে প্রতিরক্ষা স্বাবলম্বিতা এই দুটিই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে অত্যন্ত নিখুঁত নির্বাচন।”