মুহাম্মদ নূরে আলম: ‘‘যে হৃদয় শাহাদাতের উচ্চাকাক্সক্ষা লালন করে, সে হৃদয় কখনো হতাশ হয় না’’ শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত ফেসবুক থেকে নেওয়া। ফয়সাল আহমেদ শান্ত নামটি এখন পরিবারের কাছে স্মৃতি। সন্তান নিহতের প্রায় ৭ মাস পরও মা কহিনুর আক্তার কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক বাবা জাকির হোসেনও। ভাইয়ের অকাল প্রাণহানি মানতে পারছে না ছোটবোন সুমাইয়া জান্নাত বৃষ্টি। কেউ কথা বলতে এলেই অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বৃষ্টি তার বাবাকে বার বার বলতে থাকেনÑ‘আব্বু আমার ভাইয়ারে ফিরায়ে দাও’। জুলাই-আগস্ট মাসে গণআন্দোলনে চট্টগ্রাম থেকে লাশ হয়ে বরিশালের গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত। মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪ চট্টগ্রামের মুরাদপুর ২ নং গেটের মাঝামাঝি জায়গায় কোটা সংস্কারে আন্দোলনরত অবস্থায় গুলীতে নিহত হন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। ওমরগনি এমইসি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তার বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের মহিষাদী গ্রামে। শান্তর বাবা জাকির হোসেন জাহাজের পুরনো আসবাপত্রের ব্যবসা করেন; সে সুবাদে বাবুগঞ্জে থাকেন তিনি। ছোটবোন বৃষ্টি ও মা কহিনুরকে নিয়ে চট্টগ্রামের ইপিজেডে ভাড়া বাসায় থাকতেন শান্ত। দুই ভাইবোনের মধ্যে শান্ত বড়। বুধবার ১৭ জুলাই ২০২৪ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে নানা বাড়িতে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় স্বজনদের আহজারিতে স্তব্দ হয়ে উঠে পুরো এলাকা। পরে জোহর নামায শেষে মানিককাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাযা শেষে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয় তাকে। ফয়সাল আহমেদ শান্তর জানাযায় মানুষের ঢল নামে। তার মৃত্যুর খবরে বাবুগঞ্জে নিজ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৫ জুলাই ২০২৪ আন্দোলন সহিংস রূপ নিতে থাকলে প্রথমে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এর পর যোগ দেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। সংঘর্ষ চলাকালে পিস্তল নিয়ে চার ব্যক্তিকে গুলী ছুঁড়তে দেখা যায়। অস্ত্র উঁচিয়ে প্রকাশ্যে গুলী করার দৃশ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছে। মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪ বিকেলে আন্দোলনরত অবস্থায় মুরাদপুর এলাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে গুলীবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অস্ত্রধারীরা সবাই যুবলীগের নেতাকর্মী, যারা নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী।

নতুন প্রজন্মের কিংবদন্তী: মঙ্গলবার (১৬ জুলাই ২০২৪) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলমান ছিল। শহীদ ফয়সাল আর বাসায় থাকতে পারেনি। বাড়ি থেকে সবাই নিষেধ করছিল বের না হওয়ার জন্য। কিন্ত যার মনে শাহাদাতের আকাক্সক্ষা থাকে, সে কি কখনো বাধা মানে? সেদিন ফয়সাল টিউশনে যাওয়ার পথে আন্দোলনে যুক্ত হন। ষোলশহর থেকে ছাত্র-যুবলীগের নেতাকর্মীরা ধাওয়া দেন। পাল্টা ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। শান্ত ছিল সবার সামনের সারিতে। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিস্তলের গুলী ছুড়তে থাকে। এর মধ্যে একটি বুলেট শান্তর বাম পাশে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে শান্ত। কয়েকজন তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর শরীরে তিনটি গুলী লেগেছিল।

পিতামাতার অভিব্যক্তি: শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর বাবা জাকির হোসেন বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি কয়েকটি টিউশনি করাত ছেলে। একটাই ছেলে। আশা-ভরসা সবই ছিল ছেলেকে ঘিরে। ঘটনার দিন টিউশনি করাতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এর পর শান্ত ফিরে আসে লাশ হয়ে। তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেতো অধিকার চাইতে গিয়েছিল; কিন্তু সেই অধিকারের বদলে তাকে বুলেট উপহার দেওয়া হলো কেন? বিনাদোষে আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই আমি। আমি জাকির হোসেন শহীদ ফয়সালের গর্বিত পিতা এটাই আমার পরিচয়।

শান্তর মা স্কুলশিক্ষিকা কহিনুর আক্তার বলেন, যেদিন লাশ নিয়ে এসেছি, তার সামনে-পেছনে পুলিশের গাড়ি ছিল। অথচ জীবিত অবস্থায় আমার ছেলেকে কেউ নিরাপত্তা দেয়নি। উল্টো গুলী করে রক্ত ঝরিয়েছে। তিনি বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার মেয়ে বৃষ্টি পাগলপ্রায়। তাকে বুঝ দিতে পারছি না। ভাই আর ফিরবে নাÑ এটা সে মানতেই পারছে না। শান্তর মা বলেন, ‘আমার তো অনেক আশা ছিল। আমার ছেলে পড়ালেখা করে অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আসবে। আমি সেরা মা হব। সে ইচ্ছা যে এভাবে ফলে যাবে, তা কে জানত। আমার বাবা যে এত বড় অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আসবে, আমি তো বুঝতে পারি নাই। আমারে সে সেরা মায়ের সম্মান দিয়ে গেল।’ আমি শহীদের সম্মানিত মা, এখন এই পরিচয় আমার জন্য অনেক গর্বের। আল্লাহ তায়ালা শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত ভাইকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তকে বিটিভির এ প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন এ লিংককে: যঃঃঢ়ং://ভন.ধিঃপয/াওইঢতড়স৩কয/ শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত এর পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান, প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন এই লিংককে: যঃঃঢ়ং://ুড়ঁঃঁ.নব/ীএকতঁঁড়ী৭বশ?ংর=রা৮লবরটী২ডগ৪ঐহওঢ শান্তর বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি, শান্ত ও শুভ তিনজনই মুরাদপুরে আন্দোলনে যাই। ষোলশহর থেকে ছাত্র-যুবলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের ধাওয়া দেন। আমরা পাল্টা ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকি। শান্ত ছিল সামনের সারিতে। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিস্তলের গুলী ছুঁড়তে থাকে। এর মধ্যে একটি বুলেট শান্তর বাম পাশে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে শান্ত। সঙ্গে সঙ্গে আমরা কয়েকজন তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। গ্রামবাসীরা জানান, মাঝেমধ্যে গ্রামে আসলে তার দেখা মিলত। তবে তার মধ্যে কোনো ধরনের খারাপ কিছু কখনোই লক্ষ করেননি তারা। নামের সঙ্গে হুবহু মিল ছিল শান্তর আচরণের। পরিবারের পক্ষ থেকে টিউশনিতে যাওয়ার কথা বলা হলেও শান্তকে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা মিসকাত জানান, তাদের সঙ্গেই আন্দোলনে থাকা অবস্থায় গুলীবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন শান্ত। বাবুগঞ্জের মহিষাদী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শান্তর প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, শান্ত একেবারে শান্তশিষ্ট। স্কুল জীবন ও দেখেছি সে কখনও কারো সঙ্গে ঝগড়াও করেননি। তার মতো ছেলেকে গুলী করে মারবে এটা আমরা প্রত্যাশা করিনি।