স্টাফ রিপোর্টার: মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার অষ্টম দিন শেষ হলো গতকাল শনিবার। এদিন মেলা শুরু হয় সকাল ১১টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। প্রথম দুই ঘণ্টা মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। প্রথম সপ্তাহের শেষ দিনটি ছুটির দিন হওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে মেলায়। ছুটির দিনে বইমেলা পরিপূর্ণ ছিল পাঠক-দর্শনার্থীদের ভিড়ে। তবে দোকানিদের দাবি, দর্শনার্থীর তুলনায় বিক্রি খুবই কম।

গতকাল শনিবার বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা অ্যাকাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, টিএসসি ও রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন গেটে দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড়। মেলার ভেতরেও নেই পা ফেলার জায়গা। অত্যধিক মানুষের চাপে ঠিকমতো নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণও করতে পারছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়াও বই মেলার স্টলগুলো ছিল পাঠক-দর্শকে পরিপূর্ণ। কেউ বই দেখছেন, কেউ আবার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ বা আবার প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলা ঘুরে দেখছেন। শনিবার বইমেলা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান ও তিতুমীর কলেজের ফরহাদ হোসেনের। তারা জানান, এ বছর আজই প্রথম তারা মেলায় এসেছেন। তবে মেলায় এত ভিড় থাকার কারণে বেশিক্ষণ ভেতরে অবস্থান না করেই চলে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত ভিড় থাকায় ভালোভাবে হাঁটাচলা করা যাচ্ছে না বলেও জানান তারা।

মেলায় ঘুরতে এসেছেন আইরিন সুলতানা। তিনি ঢাকার আজিমপুরে থাকেন, পড়ছেন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। তিনি বলেন, আমি বুধবার মেলায় এসেছিলাম তখন খুব বেশি মানুষ ছিল না। প্রথম সপ্তাহের শুক্রবারেই যে এত ভিড় হবে ভাবতেই পারিনি। ১০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে পরে ঢুকতে পেরেছি। তবে এখন ভালো লাগছে। মেলা ঘুরে দেখছি। দুইটা উপন্যাসও কিনেছি। এদিকে মেলায় দর্শকের ভিড় থাকলেও ক্রেতা সংখ্যা খুবই কম বলে জানিয়েছেন স্টলের বিক্রেতারা। একাধিক বিক্রেতা জানান, প্রতিদিনের তুলনায় আজও মানুষের ভিড় অত্যন্ত বেশি, তবে সে তুলনায় আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে না। মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশনীর বিক্রেতা রৌহান হোসাইন বলেন, গত কয়েকদিন থেকে আজ বিক্রি বেশি। কিন্তু যে পরিমাণ দর্শক সে তুলনায় বিক্রি খুব কম। আশা করছি দ্বিতীয় সপ্তাহে দর্শনার্থী ও বিক্রি উভয়ই বাড়বে।

নতুন নতুন গল্পের বই তৈরি হচ্ছে না পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী। অথবা নতুন গল্প তৈরি করার মতো মানুষের জন্ম হয় না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদরা বারবার আসেন না। সময়ের ব্যবধানে মেলায় আসেন ইনফ্লুয়েন্সাররা। তাদের ঘিরে যে বলয় তৈরি হয়, তারা পাঠক নন, শিকারি! সেলফি শিকারি! বিষয়টি যে কত হতাশার, নিদারুণ বেদনার সেটা বোঝা যায় প্রকাশক-লেখকদের মুখের দিকে তাকালে, তাদের সঙ্গে কথা বললে। এই যেমন সৃজনশীল প্রকাশনী ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’-এর সহকারী ব্যবস্থাপক এ কে এম কামরুজ্জামান বললেন, ‘‘এই যে এত ভীড় দেখছেন, এদের মধ্যে বই কেনার লোক একেবারেই কম; এবার তো আরও কম।’’ ‘‘বিশেষ করে আমাদের বেচা-কেনা অন্যবারের থেকে অনেক কম। আমরা যেহেতু ননফিকশন টাইপের মনোনশীল বই, গবেষণা গ্রন্থ এবং ইতিহাসের বই বেশি করি, সেহেতু আমাদের পাঠকও একটু বোদ্ধা শ্রেণির ও প্রবীণ গোছের। এবার কেন যেন এই দুই শ্রেণির পাঠক বইমেলায় কম আসছেন’’- বলেন এ কে এম কামরুজ্জামান।

বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বইমেলার একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে, প্রায় প্রত্যেকটা স্টল-প্যাভিলিয়নে ঢু-মেরে কারও কাছেই বই বিক্রির সু-খবর মেলেনি। ‘মেলায় আসা বেশিরভাগ মানুষ আদতে দর্শনার্থী, বইয়ের পাঠক নন’ এই ধারণাটাই বিগত বছরগুলোর মতো এবারও ‘সত্য’ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। তবে, আয়োজনে ত্রুটি-বিচ্যুতি গতবারের চেয়ে কম। সাজ-সজ্জায় বলতে গেলে ভালোই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে এবারের মেলা পরিচালনা কমিটি।

বইমেলার অষ্টম দিনে এসে ইভেন্ট থিম, ইভেন্ট নিমোনিক, ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি, সাদৃশ্যপূর্ণ রঙ নির্দেশিকা বা কালার গাইডলাইন অ্যান্ড হারমনি, ক্রিয়েটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশন, থিমেটিক অ্যাক্সিকিউশন, ভেন্যু লেআউট ও গ্রাউন্ড প্রস্তুতি, বাংলা একাডেমির স্টল ডিজাইন, গেইট ডিজাইন, মঞ্চ ডিজাইন, গ্রাউন্ড ম্যানেজমেন্টসহ সম্পূর্ণ অবকাঠামো ডিজাইন, অ্যাক্সিকিউশন, থিমের ওপর ভিত্তি করে সৃজনশীল ইনস্টলেশন, পাবলিক ফাংশন ডিজাইন, প্রবেশ ও প্রস্থান পথের ডিজাইন, ভিজিটর অ্যানগেজমেন্ট প্ল্যানসহ সামগ্রিক দিক থেকে মেলাকে সাজানো-গোছানোই মনে হল। সবচেয়ে বড় কথা পর্যাপ্ত পানি ছিটানোয় মাত্রা অতিরিক্ত ধুলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এবারের বইমেলা। মেলার বড় একটা অংশজুড়ে ইট বিছিয়ে দেওয়ায় কাঁদা এবং ধুলার বাড়াবাড়ি থেকেও সুরক্ষা পেয়েছে বইমেলা। তবে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোড়ক উন্মোচ মঞ্চ নিদারুণ দারিদ্রের স্বাক্ষর বহন করে চলছে। লাল-সবুজ কাপড়ে তৈরি প্যান্ডেল দেখ মনে হচ্ছে উলটামুখি যাত্রাপালার মঞ্চ। বাঁশগুলো মোড়ানো হয়নি সাদা কাপড়ে। ফলে সৌন্দর্যহানীর ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে।

জানতে চাইলে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. সরকার আমিন বলেন, ‘বইমেলার সব কিছু ভালো করার চেষ্টা করেছি। দুয়েক জায়গায় হয়তো সফল হতে পারিনি। আপনাদের যৌক্তিক সমালোচনা ও পরামর্শকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সামনে এ বিষয়গুলো আমরা দেখব।’ এদিকে অতিরিক্ত দর্শনার্থীদের চাপে গেটগুলোতে ঠিক মতো পর্যবেক্ষণও করতে পারছিল না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শুধুমাত্র ব্যাগ সঙ্গে নেওয়া দর্শনার্থীদের ব্যাগ চেক করেই যেতে দেওয়া হচ্ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য বলেন, এই ছোট গেটে মানুষের এত চাপ যে এক সঙ্গে তিন-চারজন করে প্রবেশ করছে। এমনিতেই একটি লম্বা লাইন। এখন একজন একজন করে চেক করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এদিকে ছুটির দিনে বইমেলায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীরা মেলা দেখা শেষে ভিড় করছেন টিএসসি এলাকায়। যার কারণে ওই এলাকায় অত্যধিক গাড়ির চাপ পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় যানজটের।

নতুন বই: মেলায় নতুন বই এসেছে ১৮৪টি। এর মধ্যে কবিতার বই সবচেয়ে বেশি। মোট কবিতার বই এসেছে ৬০টি।