মুহাম্মদ নূরে আলম: শীত শেষ না হতেই রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে। বিশ্বের ১২৪ শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষ ৪ নম্বরে উঠে এসেছে ঢাকা। বাতাসের এই মানও নাগরিকদের জন্য ‘অস্বাস্থ্যকর’। এ অবস্থায় রাজধানীবাসীর জানালা বন্ধ রাখার পাশাপাশি ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে আইকিউএয়ার। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১২টার দিকে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার সূচক থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশে ৫ হাজার ২৫৮ শিশুসহ এক লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হাঁপানি-শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুসে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ কমিয়ে বায়ুমান উন্নত করে বছরে অন্তত ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্মকণা বায়ুদূষণে জনস্বাস্থ্যে প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

আইকিউএয়ার বাতাসের মান নিয়ে তাৎক্ষণিক সূচক প্রকাশ করে, যা একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সতর্কও করে দেয়। গতকাল সোমবার আইকিউএয়ার সূচকে সবার ওপরে আছে পাকিস্তানের লাহোর। শহরটির বাতাসের মানের স্কোর ২৬৭। বাতাসের এই মান নাগরিকদের জন্য ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকার ২ নম্বরে অবস্থান করছে ভারতের দিল্লী। শহরটির বাতাসের মানের স্কোর ২২১। এই মানও নাগরিকদের জন্য ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। ২০৪ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষ ৩ নম্বরে আছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। এরপরই ঢাকার অবস্থান। ঢাকার বাতাসের মানের স্কোর ১৯১। একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কোর মাঝারি হিসেবে গণ্য করা হয়। আর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বিবেচিত হয় ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর। অন্যদিকে স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলে ধরা হয়। পাশাপাশি ২০১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে থাকা একিউআই স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। ৩০১ থেকে ৪০০ এর মধ্যে থাকা একিউআই স্কোর ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয়, যা নগরের বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার সিআরইএ’র গবেষণা বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশের তালিকায় স্থান পায়। যেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বালুকণার বার্ষিক মান (পিএম ২.৫) ৭৯.৯ মাইক্রোগ্রাম। যা বার্ষিক জাতীয় মানদ- ৩৫ মাইক্রোগ্রামের দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- ৫ মাইক্রোগ্রামের ১৫ গুণ বেশি। বায়ুর এমন চরম দূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপর অনিবার্য পরিণতি ডেকে আনছে। বিভিন্ন বয়সীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। বায়ুদূষণের প্রভাবে উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে ২০২২ সালে সরকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ধূলিকণার মান ১৫ মাইক্রোগ্রাম থেকে বাড়িয়ে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। যা গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টির পাশাপাশি বায়ুর মান অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বায়ুদূষণ কমানো একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, যা অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উন্নয়নের ধরন, যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। আমাদের বায়ুদূষণের ৩০-৩৫ শতাংশ আসে বাইরের দেশ থেকে এবং ২৮ শতাংশ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে। তাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, জ্বালানির মান উন্নয়ন ও রিফাইনারির সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে দূষণ কমানো সম্ভব নয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রিফাইনারি উন্নত হওয়ার পরও দূষিত শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। তাই বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার সিআরইএ’র বায়ুমান বিশ্লেষক ড. জেমি কেলি বলেন, বাংলাদেশের বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার অপরিণত শিশু, কম ওজনের শিশুর জন্ম এবং শিশুমৃত্যু ঘটছে। পিএমও ২.৫ দূষণ প্রতিবছর প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন কর্মদিবসের ক্ষতি করে, যা ব্যবসা ও পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান জনস্বাস্থ্য ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সমতুল্য। ক্যাপস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি শুধু মানবদেহকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন অনুবিভাগ) তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, পিএম ২.৫ বাংলাদেশে নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বায়ুদূষণ কমাতে সরকার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন দর্শনে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।