মুহাম্মদ নূরে আলম : ২০২৪ সালে বর্ষপঞ্জির পাতায় যুক্ত হয়েছে নতুন তারিখ, জুলাই প্রলম্বিত হয়েছে ৩৬ পর্যন্ত। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে দীর্ঘ জুলাই বিপ্লবে পথে থেকেছেন ছাত্রদের সাথে হেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ। বন্দুকের মুখোমুখি নির্ভীক দাঁড়িয়ে অকাতরে জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন এই শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ। জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া এমনই একজন শ্রমিক লেগুনা চালক মো. আসাদুল্লাহ। তাদের আত্মত্যাগের কথা আমাদের বার বার প্রচার করতে হবে। তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণ একটি নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদী ও মাফিয়া শাসনের অধীন চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছে। বাংলার মানুষ হাতে হাত রেখে জুলাই বিপ্লবে লড়াই করে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারকে বিদায় করেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিদায়ের বড় অবদান রেখেছে শ্রমজীবী মানুষ।

মোহাম্মদ জৈনদ্দিন ও মোছা. রাশেদা বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান মো. আসাদুল্লাহ’র স্থায়ী ঠিকানা শেরপুর জেলার শ্রীবরদী থানার রহমতপুর গ্রামে। বিয়ে করেছিলেন কাছের মাটিয়া কুড়া গাবতলী গ্রামের মেয়ে নূরানী খাতুন (১৬) কে, যাদের বিয়ের এক বছরও পূর্ণ হয়নি এখনো। এর আগেই তিনি কিশোরী বধূকে বিধবা করে চলে গেলেন পরকালের উদ্দেশ্যে। পেশায় লেগুনা চালক শহীদ মো. আসাদুল্লাহ বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন। কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের যে আন্দোলন চলছিল তা এড়াতে পারেননি তিনি।

যেভাবে শহীদ হোন শ্রমজীবি আসাদুল্লাহ: বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ শামিল হয়েছিলেন ছাত্র-জনতার মিছিলে। অনেক কষ্টে ধার-দেনা করে তার সদ্য কেনা লেগুনাটিকে উত্তরার আজমপুর রেল ক্রসিং এর পাশে রেখে চলে গিয়েছিলেন প্রায় এক কি.মি. দূরের আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল স্পটে। ছাত্র-জনতার ওপর তখন চলছিল মুহুর্মুহু গুলীবর্ষণ। এতে আহত হয়েছে শত শত এবং নিহত অনেক। শেষ পর্যন্ত নিহতের তালিকায় যুক্ত হলেন আসাদুল্লাহও। সন্ধ্যা ছয়টার সময় পুলিশের বুলেটে ঘটনাস্থলেই শাহাদাতবরণ করেন তিনি। দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করেই চলছিল পরিবারটির। আসাদুল্লাহ’র(২৪) শ্বশুর লষ্কর আলী সামান্য সবজি বিক্রেতা। সেই শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে একটি রুম নিয়ে উত্তরার উত্তরখান থানার হেলাল মার্কেট সরকারবাড়ীতে কোনমতে থাকতেন তিনি। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ঘরে রেখে গিয়েছিলেন। স্ত্রী এবং শ্বশুর প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা নিয়ে বার বার তাকে ফোন দিচ্ছিলেন আর তিনি তাদের অভয় দিচ্ছিলেন যে, লেগুনা গাড়িটি নিয়ে তিনি বের হতে পারছেন না। মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেছেন অথচ তার পরিবার এখন পর্যন্ত জানে না যে, তিনি লেগুনা রক্ষা না বরং লেগুনাকে এক জায়গায় রেখে দেশকে রক্ষা করতে চলে গিয়েছিলেন এক কিলোমিটার দূরের আন্দোলনে। যোগ দিয়েছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে।

এর মধ্যে কিশোরী মা নূরানী খাতুনের কোলজুড়ে আয়েশা পৃথিবীতে এসেছে। এখন তার পুরো জীবন সামনে পড়ে আছে। তিনি বলেন, স্বামী নেই, বাবা-মা’র কাছে আছি। আর শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামে, তারাও খুব খারাপ অবস্থায় দিন আনে দিন খায় এরকম। এখন তাঁর প্রশ্ন, এই দুধের সন্তানকে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন? একা একা এ সন্তানটিকে তিনি কীভাবে মানুষ করবেন? নিজে গাড়ি চালিয়ে মহাজনকে টাকা দিয়ে বেশি কিছু থাকতো না হাতে। তাই টানাটানি লেগেই থাকতো। শ্বশুরকে বলেছিলেন, যদি কষ্ট করে একটি গাড়ি নিজেরা কিনতে পারতাম তাহলে একটু সচ্ছলতা আসতো। সেই চিন্তা থেকে নিজের সঞ্চয় আর ধার দেনা করে এক লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে মাসখানেক আগে একটি পুরাতন লেগুনা কিনেছিলেন। আরো বিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল সেটা ঠিকঠাক করতে। আসাদুল্লাহ’র স্ত্রী নূরানী খাতুন বলেন, ‘এখন এ লেগুনা আমাদের গলার কাঁটা হয়ে গেছে। পুরনো লেগুনা কেউ কিনতে চাচ্ছে না। আর এভাবে ফেলে রাখলে গাড়িটাও নষ্ট হয়ে যাবে। এদিকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা এখনো পরিশোধ করা বাকি আছে। কেউ যদি গাড়িটা বিক্রির ব্যবস্থা করে দিত তাহলে ধারগুলো অন্তত শোধ করতে পারতাম।’

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে প্রতি শহীদের জন্য যে দুই লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই টাকাটা তারা পেয়েছেন। ধার-দেনা পরিশোধ, হাসপাতাল বিল, লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে কাফন-দাফনে তার বিরাট একটা অংশ ইতোমধ্যেই খরচ হয়ে গেছে। বাকি অল্প কিছু টাকা দিয়ে এখন তিনি পুরো জীবন যুদ্ধ কীভাবে পাড়ি দেবেন সেই দুশ্চিন্তায় হাহাকার করে উঠলেন। কথা হয় আসাদুল্লাহ’র শ্বশুর লস্কর আলীর সাথে। দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে শহীদের স্ত্রী তার বড় সন্তান। তিনি স্বল্প পুঁজির সবজি বিক্রেতা। তিনি বলেন, সেদিন যে কি কিয়ামত গেছে আমাদের ওপর, তা কেবল আমরাই জানি। সন্ধ্যা ৬ টায় আমাকে ওই ঘটনাস্থলের কেউ একজন ওর ফোন দিয়ে বলল, আপনারা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসেন। এই ফোন যার, সে তো মারা গেছে। আমরা সেই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে রাস্তাই পার হতে পারছিলাম না। মুহুর্মুহু গুলী চলছিল। কোনমতে অনেক দূর ঘুরে আমরা হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বাবা আমার মারা গেছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বললেন, আমি যদি কিছু পুঁজি পেতাম তাহলে সবজিটা ভালো মতো বিক্রি করতে পারতাম। কিংবা নিজস্ব একটা ভ্যান যদি আমার হতো। আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার এই বিধবা মেয়েটাকে আমি নিজেই দেখবো। আমি শুধু শহীদের সন্তানটিকে দেখার জন্য সবার কাছে সহযোগিতা চাচ্ছি। চিরদিন তো আমি বেঁচে থাকব না, আমি চলে যাওয়ার পরে যেন এ বাচ্চাটাকে ওর মা মানুষের মত মানুষ করতে পারে।