মুহাম্মদ নূরে আলম : পরিবার নিয়ে রাজধানীর উত্তরায় থাকতাম। সেখানকার একটি ভবনের চারতলার বারান্দায় শুকনো কাপড় আনতে গিয়ে গুলীতে নিহত হয় আমার মেয়ে নাইমা আক্তার সুলতানা। বাড়িতে সে একদিন আমাকে বলেছিল, বাবা তোমার মতো ডাক্তার হয়ে আমিও মানুষের সেবা করব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন ১৯ জুলাই ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গুলীতে নিহত নাইমার বাবা গোলাম মোস্তফা দেওয়ান। ২০২৪ সালের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক ব্যাপক হারে মেয়েদের অংশগ্রহণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রথম যে মেয়েটি শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দিল তার নাম নাঈমা সুলতানা। বয়স ১৫ বছর। রংপুরে ১৬ জুলাই ২০২৪ আবু সাঈদকে হত্যার মধ্যদিয়ে আন্দোলন নতুন বাঁক নেয়। আন্দোলন যখন তুঙ্গে পুলিশও তখন তীব্র মারমুখী। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ছত্রছায়ায় কেবল পুলিশই নয় তৎকালীন সরকারদলীয় ক্যাডাররাও তাদের যৌথ হামলা জোরদার করে। এসবের ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই ২০২৪ শুক্রবার পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সেদিন এ কিশোরী বীর নাঈমা সুলতানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তিনি মাথায় গুলীবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।
বাবা’র বয়ানে সন্তানের শহীদ হওয়ার ঘটনা : গুলীতে নিহত নাইমার বাবা গোলাম মোস্তফা দেওয়ান জানান, সেদিন উত্তরায় ৫নং সড়কে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। উত্তরায় সড়কের পাশেই একটি ভবনের চারতলায় পরিবার নিয়ে বাস করি। সেখানকার মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল নাইমা। কে জানত বারান্দায় শুকানো কাপড় আনতে গিয়ে মাথায় গুলী লাগবে তার। সেখানেই লুটিয়ে পড়ে সে। পরে তার মা ও পরিবারের লোকজন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে জানান। ২০ জুলাই ২০২৪ নাইমার লাশ তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমুয়াকান্দির দেওয়ান বাড়িতে দাফন করা হয়। নাইমার বাবা একজন হোমিও চিকিৎসক। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল মেঝো। তার বড় বোন তাসফিয়া সুলতানা ঢাকা মাইলস্টোন কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাই আব্দুর রহমান উত্তরার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
শহীদ নাইমা’র মা বলেন, উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে বাংলাদেশ মেডিকেলের ঠিক পেছনের মেইন রাস্তার ওপর নাঈমাদের ভাড়া বাসা। গোলাম মোস্তফা (৪৪) ও আইনুন নাহার (৩০) দম্পতির মেঝ সন্তান ছিলেন তিনি। ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। এখনো বাসার ড্রইং রুম ও তার রুমে বিজ্ঞান বিভাগের বই ও গাইডগুলো থরে থরে সাজানো। পুরো ঘরের চারদিকে নাঈমার স্মৃতি। সবই আছে, শুধু নেই শহীদ নাঈমা সুলতানা। তার মা বলেন, ‘আমার মেয়েটা খুব মেধাবী ছিল। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যবসার জন্য ওর বাবা গ্রামে থাকে আর আমি বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ঢাকায় একা থাকি। ও শুধু বলতো, মা আমি আন্দোলনে যাবো, আমি মিছিলে যাবো। আমার স্কুল থেকে মিছিলে গেলে আমি যাবো, তুমি আমাকে না করতে পারবা না। শুধু নিজেই মিছিলে যেত না, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করতো। বন্ধুদেরকে বলতো, তোরাও মিছিলে আয়। সে চিত্র এঁকে এঁকে বন্ধুদেরকে নিয়ে আন্দোলনে শরিক হয়েছিল।
শহীদ নাঈমা সুলতানার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার : শহীদ নাঈমা সুলতানার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। স্বপ্ন পূরণে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এসে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন উত্তরাস্থ মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে। মৃত্যুর সময় এ স্কুলের দশম শ্রেণি বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খুব ভালো ছবি আঁকতেন। সে যোগ্যতা তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন এবারের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। উত্তরার অনেক দেয়ালে এখনো সে গ্রাফিতিগুলো জ্বলজ্বল করছে, যা এখন শুধুই স্মৃতি। এ শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে উত্তরার ছাত্র-জনতা সোনারগাঁ জনপথের একদম পশ্চিম মাথা খালপাড়ের নামকরণ করেন ‘নাঈমা চত্বর’।
শহীদ নাঈমা সুলতানা তখন তাদের বাসায় ওঠেন। বাসায় উঠে বারান্দা থেকে ২০০ গজ দূরে পুলিশের অবস্থান দেখার চেষ্টা করেন। ঠিক তখনই মুহুর্মুহু গুলীতে অসংখ্য শিক্ষার্থী লুটিয়ে পড়েন আর শহীদ নাঈমা সুলতানার ঠিক মাথার মধ্যে গুলী লাগে বেশ কয়েকটা। সাথে সাথেই তিনি বারান্দাতে লুটিয়ে পড়েন। বাসার লোকজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। তখন তাদের ডাক-চিৎকারে আশপাশের ফ্ল্যাটের মানুষজন দৌড়ে আসেন। কথা হয় শহীদের বড় বোন তাসপিয়া সুলতানার সাথে। যিনি মাইলস্টোন কলেজের একাদশ শ্রেণি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। দুই বোন ছিলেন পিঠাপিঠি। তিনি বলেন, ‘আমরা দুইজন একসাথেই স্কুলে যেতাম এবং লেখাপড়া করতাম। এ বছর আমি এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়াতে ওর সাথে আমার ক্লাসের সময়টা ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তারপরও আমাদের খুনসুটি লেগেই থাকতো। আজকে আমার একমাত্র আদরের ছোট বোনটি নেই। কাকে নিয়ে আমরা বেঁচে থাকব? আমাদের জীবনে এখন শুধুই শূন্যতা।
স্থানীয় সাংবাদিকের বর্ণনায় উত্তরায় গণহত্যার বিবরণ : শহীদ নাইমা সুলতানাদের ফ্ল্যাটের উপর তলার প্রতিবেশী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। যিনি শহীদ নাঈমার নিথর দেহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, সেদিন ছিল শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪। উত্তরার ছাত্র-জনতা এর আগের দিন অর্থাৎ ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখ বৃহস্পতিবারের গণহত্যার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। উল্লেখ্য ১৮ জুলাই ২০২৪ উত্তরায় ৩০ জনের বেশি শাহাদাত বরণ করেন। শহীদদের সঠিক সংখ্যা এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। কারণ সেদিন অনেকগুলো লাশ পুলিশ গুম করেছিল। সেদিন উত্তরার ওপর দিয়ে যেন রোজ কেয়ামত নেমে এসেছিল। এ নারকীয় গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী উত্তরার ছাত্র-জনতা তাই পরদিন ১৯ জুলাই ২০২৪ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে ছাত্র-জনতা। ওইদিন ১৯ জুলাই ২০২৪ শুক্রবার দুপুর বারোটা থেকেই শিক্ষার্থীদের সাথে চলে পুলিশ এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। শহীদ নাঈমা সুলতানা ও তার সহযোদ্ধারা বাংলাদেশ মেডিকেলের সামনের সোনারগাঁ জনপথে অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে বিকেলের দিকে পুলিশ ও সরকারদলীয় ক্যাডারদের ধাওয়ার মুখে টিকতে না পেরে বাংলাদেশ মেডিকেলের পেছনে তাদের বাসার সামনে চলে আসেন। আর পুলিশ অবস্থান নেয় বাংলাদেশ মেডিকেলের পাশের গলির মুখটাতে, একেবারে মুখোমুখি। এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ছবি ও ভিডিও এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। আশপাশের বিল্ডিং থেকে সাধারণ মানুষ যেগুলো ধারণ করেছে, সেগুলোতে খুনিদের চেহারা একদম দৃশ্যমান।
জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া শিক্ষার্থীর সম্পর্কে শিক্ষকের অভিমত : তরুণ শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়ে উত্তরাস্থ মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক সফিউল্লাহ হাশেমী বলেন, ‘আমাদের বিজয় এসেছে ঠিকই। দেশ গড়াটা এখনো বাকি। আমাদেরই সেটা করতে হবে। এখনো আমরা অনেক ধরনের সংবাদ শুনতে পাই। রাতে কেউ ঘুমাতে পারি না। তবে এসবের বেশির ভাগই গুজব।
জামায়াতে ইসলামী নাঈমার পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেয় : সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো অনুদানের কথা বললে তিনি বলেন, আমরা শুধু জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকা পেয়েছি। সরকার কিংবা আর কারো কাছ থেকে কোন সহযোগিতা আমরা এখনো পর্যন্ত পাইনি।
শহীদ নাইমা সুলতানা’র পরিবারের খোঁজ-খবর নিলেন তারেক রহমান : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুলীতে নিহত ‘শহীদ নাইমা সুলতানা’র পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’। মঙ্গলবার (২০ আগস্ট ২০২৪) বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় ‘শহীদ নাইমা সুলতানা’র বাসায় শোকাহত পরিবারের সাথে দেখা করে একটি প্রতিনিধি দল। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শহীদ নাইমা সুলতানা’র পরিবারের প্রতি সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেন সাবেক এমপি শাম্মী আক্তার।