পহেলা বৈশাখ শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে সারাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দেশবাসী উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকাসহ সারাদেশে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করছে র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেকোনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এদিন রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি, শাহবাগ, রবীন্দ্র সরোবর, মানিক মিয়া এভিনিউ, হাতিরঝিলসহ যেসব জায়গায় জনসমাগম হবে সেখানে র্যাব ও পুলিশের পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে।
গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী রমনা বটমূলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে ঘিরে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে। ঢাকাকে ২১টি বিভাগে ভাগ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রা নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে। যেখান-সেখান দিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া যাবে না। ডিএমপির কমিশনার বলেন, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ মোড়, টিএসসি, শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি, টিএসসি হয়ে পুনরায় চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে। শোভাযাত্রার পুরো রুট নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে। পাশ থেকে, বিকল্প পথে শোভাযাত্রায় প্রবেশ করা যাবে না। শোভাযাত্রার সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম পাশে চারুকলার বিপরীতে যে গেট আছে, সেটি বন্ধ থাকবে। সে সময় কেউ এই গেট দিয়ে রাস্তায়ও যেতে পারবে না। শোভাযাত্রায় যারা অংশ নিতে চান, তাদের সুবিধার্থে একটি ‘ম্যাপ’ তৈরি করা হয়েছে বলে জানান সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, শোভাযাত্রার মাথা থাকবে চারুকলার সামনে। আর শোভাযাত্রার লেজ থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির (ভিসি) বাসভবনের সামনে। এর বাইরে মাঝখান দিয়ে কোনোভাবেই কারও শোভাযাত্রায় প্রবেশের সুযোগ নেই। শোভাযাত্রায় যারা যোগদান করবেন, তাদের শাহবাগ মোড় থেকে অথবা ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষে যারা শোভাযাত্রায় অংশ নিতে চান, তারা শাহবাগ হয়ে কাঁটাবন মোড় দিয়ে নীলক্ষেত মোড় হয়ে ঢাবি ভিসির বাংলোর সামনে থেকে অংশ নেবেন। এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠান যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই নির্বিঘ্নে উদ্যাপন করতে পারেন, সে জন্য ডিএমপি ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানান সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, সোমবার বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ উদ্যাপিত হবে। উৎসবের টানে নগরবাসী সমবেত হবেন রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবন, রবীন্দ্রসরোবর ও হাতিরঝিল এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে। এককথায় পুরো ঢাকা নববর্ষ উদ্যাপনে প্রস্তুত। উল্লিখিত এলাকা ছাড়াও ঢাকার অধিকাংশ স্থানে নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হবে। বাংলা বর্ষবরণ উৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরকে ২১টি সেক্টরে ভাগ করে ইউনিফর্ম ও সাদাপোশাকধারী পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে উল্লেখ করেন সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাস্থলে ডগ স্কোয়াড দ্বারা সুইপিং করা হবে। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ মোট ২১টি স্থানে ব্যারিকেড থাকবে। প্রতিটি অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশমুখে আর্চওয়ে ও হ্যান্ড মেটাল দিয়ে তল্লাশি করা হবে। অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়া ও শোভাযাত্রার রুটগুলো সিসি ক্যামেরা, স্থির ও ভিডিও ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। অনুষ্ঠানের চারপাশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুট প্যাট্রোল থাকবে। সিটিটিসি, সোয়াত ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে পোশাকে ও সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। ইভ টিজিং ও ছিনতাই প্রতিরোধ সাদাপোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের দল মোতায়েন থাকবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার’ থাকবে। সেখানে মাইকিং ব্যবস্থা থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি ও সাইবার প্যাট্রোলিংয়ের মাধ্যমে নববর্ষকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার রোধে নজরদারি করা হচ্ছে।
নববর্ষে অংশ নিতে আসা নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে সাজ্জাত আলী বলেন, সবার নিরাপত্তার স্বার্থে তল্লাশিকাজে তিনি সহযোগিতা কামনা করছেন। অনুষ্ঠানস্থলে কোনো ধরনের ব্যাগ, ধারালো বস্তু ও দাহ্য পদার্থ নিয়ে না আসার জন্য তিনি অনুরোধ করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে, অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে হবে। কোনো ধরনের আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো যাবে না। শব্দদূষণ হয়—এ ধরনের কোনো বাঁশি ব্যবহার করা যাবে না। বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য বাজারজাত করা যাবে না। বিশেষ করে শোভাযাত্রায় ও অন্যান্য অনুষ্ঠানস্থলে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হবে সকালে। এই অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময় শেষ হবে। ছায়ানটের এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তিনটি গেট দিয়ে ঢুকতে হবে রমনা বটমূলে। তবে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হওয়া যাবে দুটি গেট ব্যবহার করে। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আগ্রহী নগরবাসীর উদ্দেশে সাজ্জাত আলী বলেন, যারা নারী ও শিশু সঙ্গে নিয়ে আসবেন, তাঁরা যেন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভিড় এড়িয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেন। তাঁরা যেন প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নির্ধারিত গেট ব্যবহার করেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত উদ্যানে প্রবেশ করা যাবে।
এদিকে সকালে রমনা বটমূলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে এক ব্রিফিংয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেকোনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে থাকবে র্যাব। নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ঝুঁকি নেই বলেও জানান তিনি। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মিডিয়া এনামুল হক সাগর গতকাল রোববার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, পহেলা বৈশাখ শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময়ভাবে উদযাপনে আমরা ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিটি স্থানকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনও নিরাপত্তা হুমকি নেই। তবে, আমরা সতর্ক আছি। বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র সাগর বলেন, পহেলা বৈশাখ শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের জন্য ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই ইউনিফর্ম এবং সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।