নাছির উদ্দিন শোয়েব : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হঠাৎ সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানামুখী অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় কিশোর গ্যাং ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’-এর আধিপত্যের জেরে খেলার মাঠে স্কুলছাত্র আদনান কবিরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপরই রাজধানীজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা সবার নজরে আসে। এঘটনার পর থেকে বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে শক্তভাবে অভিযান চালিয়ে আসছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
সর্বশেষ গত সোমবার রাতে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ৯/এ সড়কে মোটরসাইকেলে করে মেহেবুল হাসান ও তার সহকর্মী নাসরিন আকতার বাসায় ফেরার পথে তাদেরকে রামদা দিয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে আহত করে একদল কিশোর-তরুণ। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা ও জলপাই রঙের শার্ট পরিহিত দুই তরুণ একজন পুরুষ ও তার সঙ্গে থাকা নারীকে রামদা দিয়ে কোপাচ্ছে। হামলাকারীদের ফোন পেয়ে সেখানে আরও চার-পাঁচজন দেশীয় অস্ত্রসহ ঘটনাস্থলে এসে মেহেবুল হাসান নামে ওই ব্যক্তিকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে এবং তাকে অপহরণের চেষ্টা চালায়। তাকে রক্ষা করতে গেলে নাসরিন আকতার নামে এক নারী হামলার শিকার হন। এসময় তিনি চিৎকার করে সাহায্য চাইলে স্থানীয়রা ও উত্তরা পশ্চিম থানার টহল পুলিশ এগিয়ে আসে। হামলার সময় এলাকাবাসী দুইজনকে ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। তারা পুলিশের গাড়িতে বসেও এলাকাবাসীকে কুপিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া কোপানোর ঘটনায় সরাসরি জড়িত আলফাজ (২৩) নামের একজনসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উত্তরায় ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওর পর আবারও আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতা।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জোর উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। থানা পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে দেশজুড়ে ডেভিল হান্ট নামে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সদরদফতর থেকে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রকাশ্যে রিকশারোহী দুই জনকে এভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে। ওই ঘটনায় পুলিশের উদ্ধার করা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ কয়েকটি টিভি চ্যানেলের খবরে দেখানোর পর সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কঠোর হাতে দমন না করতে পারলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিনই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া কুপিয়ে জখম, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো ভয়ংকর অভিযোগও এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে রয়েছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এমনকি খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে এসব কিশোর-তরুণ। এতে আতঙ্কিত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। আওয়ামী লীগের পতন হলেও দল পাল্টে এখনো অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। অতীতের মতো এখন তারা কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দুর্ধর্ষ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের আগ্রাসন বেশি। এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে কিশোররা। এ কারণে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে দ্বিধাবোধ করছে না। সম্প্রতি অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় থেকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাণ্ডব চালাচ্ছে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে কাজ চলমান। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর সূত্র বলছে, ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ৪০ শতাংশই কিশোর। আগের চেয়ে তাদের দলের সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজারের বেশি। তাদের হাতে এখন পিস্তলসহ আধুনিক ধারালো অস্ত্রও রয়েছে। উত্তরায় ২০১৭ সালে আদনান খুনের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৮ বছরে রাজধানীতে বিভিন্ন গ্যাং ও গ্রুপের দ্বন্দ্বে প্রাণ হারিয়েছে দেড় শতাধিক যুবক, তরুণ ও কিশোর।
উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের দ্বারা দু‘জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করেন, কিশোর গ্যাং-এর দৌরাত্ম্য, ছিনতাই আগের চেয়ে কমেছে। তবে সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কীভাবে উন্নতি করা যায়, সভায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরা এলাকার গ্যাংগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইন স্টার, পাওয়ার বয়েজ, বিল বস, নাইন এম এম বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, আলতাফ জিরো, ভাইপার, তুফান। মিরপুর এলাকায়-সুমন গ্যাং, পিচ্চি বাবু, বিহারি রাসেল, বিচ্ছু বাহিনী, সাইফুল গ্যাং, বাবু রাজন, রিপন গ্যাং, সাব্বির গ্যাং, নয়ন গ্যাং এবং মোবারক গ্যাং। ধানমন্ডিতে একে ৪৭, নাইন এম এম ও ফাইভ স্টার বন্ড। বংশালে রয়েছে জুম্মন গ্যাং, তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্যাং, মুগদায় চান জাদু, ডেভিড কিং ফল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, কলতাবাজার, পানিটোলা, লালকুঠি, শ্যামবাজার, ইসলামপুর, বাবুবাজারসহ সদরঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফেরদৌস গ্রুপ, সাজু গ্রুপ, সিনিয়র গ্রুপ, জুনিয়র গ্রুপ, টাইগার গ্রুপ, চিতা গ্রুপের সদস্য অপরাধের শীর্ষে। মোহাম্মদপুরে ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, আনোয়ার ওরফে শুটার আনোয়ার গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, দ্য কিং অব লও ঠেলা গ্রুপ, ডায়মন্ড গ্রুপ, আই ডোন্ট কেয়ার (আইডিসি), মুরগি গ্রুপ, সাব্বির গ্রুপ, শাওন গ্রুপ, ফিল্ম ঝিরঝির, স্টার বন্ড, গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল, কোপাইয়া দে গ্রুপ।
সম্প্রতি ঘটা কয়েকটি ঘটনা: উত্তরা ঘটনা ছাড়াও গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের গোলাগুলীর মধ্যে জিলানী (৫৫) নামে এক পথচারী গুলীবিদ্ধ হন। তলপেটে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হন পুলিশের চারজন সদস্যসহ সাতজন। হামলার ঘটনার নেপথ্যে রায়েরবাজার বোর্ড ঘাট এলাকার কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপ’ জড়িত বলে জানায় পুলিশ। নেতৃত্ব দেয় ল্যাংড়া হাসান, ফরহাদ ও চিকু শাকিল। সবমিলিয়ে হামলা চালায় ৩০-৪০ জন। গত ২২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে সাদেক খান কাঁচাবাজার এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়। নিহতরা হলো নাসির (৩০) ও মুন্না (২২)। গত ১২ নভেম্বর শাখাওয়াত হোসেন ও তার বন্ধু মো. আলমগীর হোসেন উত্তরার জমজম টাওয়ারের সামনে থেকে হাউজ বিল্ডিংয়ে যাওয়ার জন্য অটোরিকশা নেন। তখন আটক এক কিশোরও তাদের সঙ্গে একই রিকশায় ওঠে। যাওয়ার পথে কিশোর গ্যাংয়ের ৭-৮ জনের সহায়তায় দুই বন্ধুকে ভয় দেখিয়ে দুটি মোবাইল ও নগদ ১৯ হাজার ৬০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া নেয়। পরে তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে। এভাবে পুলিশও বাদ যাচ্ছে না ভয়ংকর এ গ্যাংয়ের হাত থেকে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সমাজের এহেন বাজে কাজ নেই যাতে তারা করছে না।