তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : দেশজুড়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামের অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। প্রথমদিন গাজীপুর জেলায় এই অভিযান শুরু হলেও আজ রোববার থেকে সারাদেশে তা জোরদার করা হবে। গতকাল শনিবার “অপারেশন ডেভিল হান্ট” শুরু করার ঘোষণার পরপরই জনমনে একদিকে উৎসুক্য, অপরদিকে ভীতির ছাপ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের স্মৃতিতে ওঠে আসে বিগত দিনের নানা অভিযানের ভালো মন্দ দিক। এর আগে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাত (কার্যত ১৭ই অক্টোবর) থেকে সারাদেশে একযোগে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। সে সময় ওই অভিযানের নাম ছিল “অপারেশন ক্লিনহার্ট”। অপারেশন ডেভিল হান্ট-ঘোষণার পর থেকেই অভিযানটি কেমন হবে, কত দিনের জন্য চলবে-এমন নানা প্রশ্ন দেখা দেয় জনমনে। যদিও শুরু হওয়া এই অভিযানটি নিয়ে পুরোপুরি কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। ক্লিনহার্ট অপারেশনের ২২ বছর পর শুরু হলো ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ।

জানতে চাইলে গতকাল রাতে পুলিশের আইজি বাহারুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, অপারেশন ডেভিল হান্ট নিয়ে রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সমন্বয় সভা হবে। তাতে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযান জোরদার করা হবে। এজন্য একটি সমন্বয় কক্ষ স্থাপন করা হবে। অভিযানের রূপরেখাও চূড়ান্ত করা হবে। সমন্বয় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকেই দেশজুড়ে অভিযান চলবে, তা কতোদিন চলবে কিভাবে চলবে তা জানানো হবে দেশবাসীকে। গাজীপুর জেলা দিয়েই অভিযানের কাজটা শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়ে গতকাল শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনার পর সারাদেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামের অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে যৌথ বাহিনী। বিবৃতিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। “গতকাল (শুক্রবার) রাতে গাজীপুরে ছাত্র-জনতার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনায় আজ (শনিবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। “সভায় সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে,” বলা হয়েছে বিবৃতিতে। গতকাল শনিবার থেকেই গাজীপুরসহ সারাদেশে এই অভিযান শুরু হয় এবং আজ রোববার এ ব্যাপারে সাংবাদিক সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে বিবৃতিতে উল্লেখ রয়েছে।

গাজীপুরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা হবে বলে স্বরাষ্ট্র মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর আশ্বাসের কয়েক ঘণ্টা পরই অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত এলো। গতকাল বেলা ১২ টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে গিয়ে ওই আশ্বাস দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুর নগরের ধীরাশ্রম দাক্ষিণখান এলাকায় সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়ি ভাঙচুরের খবর পেয়ে ঠেকাতে যান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন। পরে সেখানে বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে স্থানীয়রা তাদের ওপর হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ১৩ জন আহতের খবর দিয়েছিলেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের এডিসি (উত্তর) রবিউল ইসলাম।

অপারেশন ক্লিনহার্ট

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। কারণ, তার আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি হওয়া বিএনপি সেটি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন।

দুই হাজার দুই সালের ১০ই অক্টোবর সরকারের এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্বীকার করেন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোন উন্নতি হয়নি। সন্ত্রাস নির্মূলে আরো সময় চাইলেন খালেদা জিয়া। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করেন। "যে দ্রুততার সাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে দেশবাসী আশা করেছিলেন সেটা হয়নি," জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন খালেদা জিয়া।

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে সন্ত্রাস নির্মূলে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালের ১৬ই অক্টোবর মধ্যরাত, কার্যত ১৭ই অক্টোবর থেকে সারাদেশে একযোগে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। মধ্যরাতে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে অভিযান শুরু হয়। সেনা অভিযান শুরু আগে পুলিশকে কিছুই জানানো হয়নি। সেনা সদস্যদের গাড়ি যখন রাস্তায় নামে তখনই সবাই বুঝতে পারে যে অভিযান শুরু হয়েছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল যে এটি সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআরের যৌথ অভিযান। প্রকৃতপক্ষে পুরো অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। প্রথম দিনের অভিযানে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় সেনাবাহিনী।

তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রথম দিনের অভিযানে প্রায় ১৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বিএনপি নেতাকর্মী। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তিনজন কমিশনারকেও আটক করা হয় এসময়। এছাড়া চট্টগ্রামেও দুজন ওয়ার্ড কমিশনারকে আটক করা হয়। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন গ্রেফতারের তালিকায়। অভিযানের প্রথম দিনে বগুড়ায় এক বিএনপি নেতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করে তার সমর্থকরা। এ সময় সেনাবাহিনী গুলি চালালে একজন রিকশাচালক নিহত হন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে প্রথম দিনের অভিযান সফল হয়েছে।

আকস্মিক সেনা অভিযানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা বিস্মিত হয়ে পড়েন। কারণ, এই অভিযানের বিস্তারিত বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র কয়েকজন মন্ত্রী ছাড়া অনেকেই জানতেন না। যদিও মন্ত্রিসভার একটি বিশেষ বৈঠকে সেনাবাহিনী নামানোর বিষয়ে জানানো হয়। কিন্তু বৈঠক শেষ হবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনী ৮৪দিন অভিযান পরিচালনার পর তাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়।

তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে জানা যায়, অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে ১২ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া দুই হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩০ হাজার রাউন্ড গুলী উদ্ধার করা হয়। এই অভিযানে প্রায় ২৪ হাজার সেনা সদস্য, সাড়ে তিনশ’ নৌ, প্রায় এক হাজার বিডিআর, প্রায় সাতশ’ আনসার ও পুলিশ নিয়োজিত ছিল।