মুহাম্মদ নূরে আলম: টগবগে যুবক শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেন। বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। অভাবের তাড়নায় সংসারের হাল ধরতে ঢাকায় অফিস সহকারীর চাকরি শুরু করেন। সারা মাস খেটে চাকরির সামান্য বেতন ও গ্রামের বাড়িতে বাবার চাষাবাদের আয়ে চলত তাদের সংসার। কিন্তু শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেন ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি ছিলেন তার নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র রোজগার করা ব্যক্তি। ছেলেকে হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা এখন অসহায় এবং দিশাহারা। ২০২৪ সালে দেশব্যাপী জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের চালানো গুলী গলায় বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কুরআনের এই হাফেজ। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর একটি ছায়া সুনিবিড় গ্রামে শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনের জন্ম। এই গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আমোদ আলী ও তার স্ত্রী রাশিদা খাতুন। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড় সাব্বির হোসেন (২৩)। দ্বিতীয় সন্তান সুমাইয়া খাতুন স্থানীয় ডিএম কলেজে লেখাপড়া করে। ছোট ছেলে সাদিক হোসেন স্থানীয় মাদরাসায় পড়ে।

শৈলকুপা হাবিবপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে হাফেজি পাস করা সাব্বির সংসারের অভাব মেটাতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় পাড়ি জমান। রাজধানীর উত্তরায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে অফিস সহকারী হিসেবে চাকরি শুরু করেন হাফেজ সাব্বির। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শুরু থেকেই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেন।

পরিবারের বর্ণনায় যেভাবে শহীন হন: চাচাতো ভাই শৈলকুপা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আব্দুল হালিম মণ্ডল জানান, ২০২৪ সালের বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ কাকডাকা ভোর থেকেই ঢাকার রাস্তায় নামেন আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্দোলনকারীদের পানি আর জুস খাওয়ানোর দায়িত্ব পড়ে শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনের ওপর। আন্দোলন দমনে সমগ্র উত্তরা এলাকায় ওই দিন পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। সারাদিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও গোলাগুলীতে উত্তরার আজমপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেন পকেটের টাকায় পানি আর জুস কিনে সারাদিন পিপাসার্ত আন্দোলনকারীদের মাঝে তা বণ্টন করেন। এটা দূর থেকেই ফ্যাসিবাদের দোসররা খেয়াল করে। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সাব্বির একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ গুলীবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সহযোদ্ধারা তাকে কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ ভোরে তার লাশ নিজ গ্রামে পৌঁছে। সাব্বিরের লাশ সকাল ১০টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

চাচাতো ভাই আব্দুল হালিম মণ্ডল আরো জানান, ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক পাঁচটা। উত্তরার আজমপুর ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে পুলিশের টিয়ারশেলে আন্দোলনরতরা যখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, ঠিক তখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলী চালায়। এ সময় হঠাৎ একটি বুলেট এসে শহীদ হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনের গলায় বিদ্ধ হলে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে রাজপথ লাল হয়ে যায়। আন্দোলনরত ছাত্ররা উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। মহৎ প্রাণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের টাকা খরচ করে পানি ও জুস নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এটা বিরল ঘটনা। অবশেষে শাহাদাতের অমীয়সুধা পান করে দেশকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী হানাদার মুক্ত করে গেছেন।

শহীদ সাব্বিরের এক প্রতিবেশী জানান, রাত ২টার দিকে হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মির্জাপুর গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। কিন্তু শৈলকুপা থানার একদল পুলিশ লাশ দ্রুত দাফন করার জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পরে এলাকাবাসীর পাল্টা চাপের মুখে পুলিশ তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। সকাল ৯টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় লাশ দাফনের জন্য।

ছেলে নেই, তবু বিছানা গুছিয়ে রাখছেন মা: সাব্বিরের থাকার ঘরে গিয়ে দেখা গেল, আগের মতোই বিছানাটি পাতা আছে। আলনায় ঝুলছে তার ব্যবহার করা কাপড়চোপড়। মা রাশিদা খাতুন সারাক্ষণ তার নিহত ছেলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নাড়াচাড়া আর স্মৃতি নিয়ে আহাজারি করেন। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রুশিক্ত কণ্ঠে জানান, সাব্বিরের মোটরসাইকেল কেনার খুব আগ্রহ ছিল। প্রায়ই কিনে দিতে বলত। আমি তাকে বুঝিয়ে বলতাম, বোনটাকে আগে বিয়ে দাও। কয়টা গরু পুষেছি। ওগুলো বিক্রি করে মেয়ের বিয়ের খরচ মিটিয়ে তারপর তোমার মোটরসাইকেল কিনে দেব। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যার পর সাব্বির মোবাইল করেছিল। পরিবারের সব ভালো-মন্দ খবর নিয়েছিল। বেতন হলে টাকা পাঠাবে বলেছিল। সাব্বিরের বাবার বয়স হয়ে গেছে। তিনি এখন কাজ করতে পারেন না। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে সাব্বির সংসারের হাল ধরেছিলেন। সাব্বিরের মৃত্যুতে গোটা পরিবার এখন অসহায় ও দিশাহারা। পিতা আমোদ আলী জানান, সাব্বির লেখাপড়ায় খুব একটা এগুতে পারেনি। স্থানীয় আমেনা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কয়েক বছর পড়ালেখা করে। তারপর ভর্তি হয় স্থানীয় মাদ্রাসায়। সেখানে কুরআনে ১০ পারা হাফেজ হয় সে। পাড়াশোনা এখানেই ইতি। এরপর বাউন্ডুলে জীবন। তবে সাব্বির ছোট বেলা থেকেই পরোপকারী ছিল বলে জানান তিনি। সাব্বির ছয় কি সাত বছর আগে ঢাকায় গিয়ে টাইলস মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। মাঝে মাস দুয়েক বাড়ি এসে বসেছিলেন। এরপর আবার ঢাকায় গিয়ে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে অর্গান লিমিটেড কেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন।

পরিবার ও মানুষের অভিব্যক্তি: এলাকাবাসী জানান, হাফেজ মো. সাব্বির হোসেন শহীদ হওয়ার পর থেকে তার বাবা আমোদ আলী মণ্ডল ও মা রাশিদা খাতুন ঠিকমতো কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলেন না। সন্তান হারিয়ে মা রাশিদা খাতুন একরকম পাগলপ্রায়।

চাচাতো ভাই আব্দুল হালিম মণ্ডল জানান, হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনের ছোট বোন শৈলকুপা দুঃখী মাহমুদ ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে আর ছোট ভাই ঝিনাইদহ শহরের বাস টার্মিনাল এলাকার একটি মাদরাসায় হাফেজি পড়ছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া হাফেজ সাব্বিরের বাবা আমোদ মণ্ডলও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ।

হাফেজ সাব্বির হত্যার বিচার চান পরিবার: সন্তানের হত্যার বিচার চেয়ে সাব্বিরের বাবা আমোদ আলী মণ্ডল বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোসররা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে। হাফেজ মো. সাব্বির হোসেনসহ জুলাই বিপ্লবে হত্যার শিকার সবার বিচার হলে আগামীতে বাংলাদেশে আর কেউ রাজপথে ছাত্রহত্যার সাহস দেখাবে না। বুক খালি হবে না কোনো বাবা-মায়ের। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু অর্থের জোগান নেই। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা সাব্বিরের বাবা-মায়ের। এছাড়া ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ পরিবারে আর্থিক চাহিদাও কিভাবে মেটাবেন তা নিয়েও চিন্তিত তারা। তাই তারা সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন। তারা তাদের জীবদ্দশায় সন্তান হত্যার বিচারও দেখে যেতে চান। আর সরকার যেন তাদের বাড়ির পাশে একটি মসজিদ করে দেয়। যেখানে বসে এলাকাবাসী তাদের ছেলের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন। এটুকুই চাওয়া সাব্বিরের বাবা-মায়ের।

ঝিনাইদহ জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক আনিচুর রহমান বলেন, আহত-নিহতদের বিষয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাই চলছে। নিহতদের পরিবারগুলো যাতে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সুরক্ষা পায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। তাদের পক্ষ থেকে এ পরিবারটির নিয়মিত দেখভাল করা হচ্ছে। তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ইতোমধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।