সিএনজিতে মিটার পদ্ধতিতে ভাড়া বন্ধের দাবিতে গতকাল রোববার সকালে হঠাৎ করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছে সিএনজি চালকরা। এর ফলে সরকারি অফিস খোলার শুরুর দিনই সকাল-সকাল অকার্যকর হয়ে পড়ছে ব্যস্ত নগরী ঢাকা। বাস বা অন্য কোনো পরিবহন চলাচল করতে না পারায় দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে অবর্ণীয় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে গতকাল রোববার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি চালকদের অবরোধের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মিটারের মামলা ইস্যুতে সিএনজি চালকরা সড়ক অবরোধ করে যান চলাচলে বাধা দিচ্ছেন।

মিটারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করলে জরিমানা বা কারাদন্ডে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। তবে অবরোধের ৬ ঘন্টার মাথায় এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিআরটিএ। সিদ্ধান্তটি বাতিল করেছে সংস্থাটি। রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, ৪ স্ট্রোক থ্রি-হুইলার যান সম্পর্কিত বিআরটিএ কর্তৃক ইস্যুকৃত সাম্প্রতিক নির্দেশনাটি বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা হলো এবং অবরোধ প্রত্যাহার করে যান চলাচলে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলো। এদিন সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর-১৪ এবং রামপুরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধের ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সকালে রাজধানীর রামপুরা, মিরপুর ১৪ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট অবরোধের খবর পাওয়া যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, অবরোধের কারণে রাজধানীজুড়ে প্রচ- যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি করছেন।

চালকরা নতুন নিয়ম বাতিল, ভাড়া বৃদ্ধি ও পুলিশের হয়রানি বন্ধসহ একাধিক দাবি জানাচ্ছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা সড়ক অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, মিটারের ভাড়া বৃদ্ধি এবং মিটারে না চললে জরিমানার আইন বাতিল করতে হবে। বিআরটিএ এ সিদ্ধান্ত বাতিল না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলতে থাকবে। এদিকে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উপস্থিত ছিলেন।

রামপুরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, সকাল ৯টার পর থেকে রামপুরা এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে সিএনজি চালকরা। তাদের রাস্তা অবরোধের কারণে রামপুরা এলাকায় যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি তারা যেন এই সকালের সময়ে রাস্তা অবরোধ ছেড়ে দেয়।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি মিটারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করলে চালকদের জরিমানা বা কারাদন্ডের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)।

নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ৩৫(৩) ধারা অনুযায়ী রুট পারমিটপ্রাপ্ত অটোরিকশাগুলো যেকোনও গন্তব্যে যাত্রী নিতে বাধ্য। চালকরা মিটারের চেয়ে বেশি ভাড়া দাবি বা আদায় করতে পারবেন না। যদি কেউ এই নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তাহলে আইনের ৮১ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, ছয় মাসের কারাদ- বা উভয় দ- দেওয়া হবে। এ ছাড়া চালকের লাইসেন্স থেকে এক পয়েন্ট কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে।

বিআরটিএ’র তথ্য বলছে, বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত অটোরিকশা রয়েছে ২০ হাজার ৮৯৪টি। আর ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের (১০ বছর) মধ্যে সবচেয়ে বেশি অটোরিকশা নিবন্ধন পেয়েছে ২০১৯ সালে। সে বছর নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৮৩৯টি অটোরিকশা। তার আগের বছর ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৬৩৭টি অটোরিকশা নিবন্ধন দেওয়া হয়।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, মিটারের ভাড়া বৃদ্ধি এবং মিটারে না চললে জরিমানার আইন বাতিল করতে হবে। বিআরটিএ এ সিদ্ধান্ত বাতিল না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলতে থাকবে।

সিএনজি চালক বাবু বলেন, মিটার পদ্ধতিতে ভাড়া চাই না। মিটার থাকলে পুলিশ, পাবলিক এবং মালিকের অত্যাচার চলতে থাকে। মিটার মানেই যন্ত্রণা। আমিরা চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় গাড়ি চালাতে চাই। মিটার থাকলেই পুলিশের ধান্দা হয়।

আরেক সিএনজি চালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এই মামলা বড়জোর ২ থেকে ৩ হাজার হলে ভালো হতো। তা-ও বেশি হয়ে যায়। সরকার ৫০ হাজার টাকা জরিমানার আইন করেছে এবং অনাদায়ে ৬ মাসের জেল। এই আইন আমরা মানি না। এ আইনের ফলে চালকরা ভয়ে গাড়ি চালায়।

আরেক চালক নূর আলম বলেন, একবার দুই হাজার টাকার মামলা না ভাঙালে পরের বার চার হাজার টাকার মামলা দেয়। গ্যাস, জমা, রাস্তার খরচ দিয়ে আমরা বউ-পোলাপান নিতে চলতে পারি না।

গণপরিবহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন হৃদয় আহমেদ। তিনি বলেন, ঢাকা এখন দুর্ভোগ আর আন্দোলনের নগরী। কিছু হলেই আন্দোলন। আমাদের তো জীবন নেই। সাধারণ মানুষ এই দেশের জন্য বোঝার মতো, কিছুই বলার নেই।