আন্দোলন সাত দিনের জন্য স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গতকাল সোমবার বিকেলে মহাখালী রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অবরোধের মুখে বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন চলাচল। অবরোধের মুখে নোয়াখালী অভিমুখের উপকূল এক্সপ্রেস ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের দিকে ফেরত যায়। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে পুলিশ সদস্যরা। এছাড়াও প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান। রেলপথ অবরোধের কারণে কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্টেশনে বেশ কয়েকটি ট্রেন আটকে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাখালী রেলগেট এলাকায় চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এদিকে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। আর শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধে যানবাহন না পেয়ে আগের দিনের মতো চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মানুষ। আগামী ৭ দিনের মধ্যে তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ইস্যুতে সরকার পদক্ষেপ নেবে এমন আশ্বাসে গতকাল রাতে আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন শিক্ষার্থীরা।

আটকে যাওয়া ট্রেনের লোকোমাস্টার লতিফ বলেন, উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ৩টা ২৫ মিনিটে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে আসে। আমার ট্রেনের গতিসীমা ছিল ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যে রেলগেটে দূর থেকেই লাল পতাকা ও মানুষের জটলা দেখতে পাই। পরে ট্রেনটি দ্রুত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গতি কমিয়ে থামাতে সক্ষম হই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, হঠাৎ ট্রেন থামাতে বেগ পেতে হয়েছে। তবে কোনো সমস্যা হয়নি।

এর আগে কলেজের মূল ফটকের সামনের অবরোধ থেকে মিছিল নিয়ে মহাখালী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীদের ‘অ্যাকশন টু অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘তিতুমীর আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘টিসি না টিউই, টিউই টিউই’, ‘আমার ভাই অনশনে, প্রশাসন কী করে’, ‘প্রশাসনের সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, চলবে না চলবে না’, ‘অধ্যক্ষের সিন্ডিকেট, মানি না মানব না’, ‘আমাদের সংগ্রাম, চলছে চলবে’ ইত্যাদি বিভিন্ন স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে আছে পুলিশ। মহাখালী আমতলী মোড় ও রেলগেট এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে পাশেই পুলিশের একটি জলকামানও প্রস্তুত রাখা আছে দেখা যায়।

উল্লেখ্য, সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে বেশ কয়েকমাস ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। এই দাবিতে মিছিল, সড়ক-রেলপথ অবরোধ, স্মারকলিপি প্রদান, ক্লাস বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া না পেয়ে গত বুধবার বিকেল থেকে দাবি আদায়ে আমরণ অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। সবশেষ রোববাররাতে তিতুমীর কলেজ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ৩ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়েছে। দাবিগুলো হচ্ছে -তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করে তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করে যোগ্যতা বিবেচনায় নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। এবং তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর আইন উপদেষ্টার চাপ সৃষ্টি করার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির দায়ভার মাথায় নিয়ে আইন উপদেষ্টাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, সোমবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য ঘটনাস্থলে আসেন। শরীফুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর মহাখালীতে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করেছেন। সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, বিজিবি সদস্যরা রেলগেটের পাশের এসকেএস টাওয়ারের সামনে অবস্থান করছেন। আর পুলিশ, ডিবি, এপিবিএন সদস্যরা মূল অবরোধস্থলের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত এখান থেকে তারা সরবেন না। যেকোনো মূল্যেই হোক রাষ্ট্রীয়ভাবে আজকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিতে হবে।

যা বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা : তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৫ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ মন্তব্য করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে তিতুমীর কলেজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারের নাভিশ্বাস অবস্থা। তাদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষও অতিষ্ঠ। তিনি বলেন, তিতুমীর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে কারা জড়িত আপনারা সবাই তা বোঝেন, জানেন। শিক্ষার্থীদের রেললাইন ছেড়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি পেশ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে রেললাইন অবরোধ করা তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে জনগণই তুলে দেবে। তিতুমীর কলেজ আন্দোলন করে মানুষের ভোগান্তি তৈরি করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সারাদেশে যাতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে আরও ভালো হবে।

সড়ক ও রেলপথে তীব্র ভোগান্তি : এদিকে ফ্লাইওভার ব্যবহার করে কিছু যানবাহন চলাচল করলেও ভোগান্তিতে পড়েছেন এই রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ মানুষ। এর আগে বিকেল পৌনে ৩টায় কলেজের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে মহাখালী রেলক্রসিংয়ে এসে সড়কপথ ও রেলপথ অবরোধ করে দেন তারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, আন্দোলকারীরা মহাখালী রেলক্রসিংয়ের ওপর অবস্থান নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় তাদের মধ্যবর্তী স্থানে রেখে চারদিকে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা গেছে। এতে সাধারণ মানুষকে হেঁটে আন্দোলনরত স্থান পাড়ি দিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে শ্যামলী, ফার্মগেটের দিক থেকে আসা গাড়ি মহাখালী রেলক্রসিংয়ের আগ থেকে ইউটার্ন নিতে দেখা গেছে। ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে উঠছেন গাড়িতে। এছাড়া উত্তরাগামী গণপরিবহনগুলোকে ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে দেখা যায়। মহাখালী চেয়ারম্যানবাড়ি থেকে হেঁটে রেলগেটে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন এত এত আন্দোলনে আমরা অতিষ্ঠ। প্রতিটা দিন এই আন্দোলনের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায়ই কেটে যাচ্ছে। এভাবে কি কোনো দেশ চলতে পারে? অন্য এক পথচারী হান্নান শেখ বলেন, মানুষের একটা যৌক্তিক দাবি থাকে, সেটার কারণে আন্দোলন হলে ঠিক আছে। কিন্তু এটা আবার কেমন দাবি তাদের? মন চাইলেই যে কোনো বিষয়ে দাবি জানালাম আর রাস্তায় বসে পড়লাম? এমন হলে আমরা সাধারণ মানুষ কোথায় যাবো? রেলগেট সংলগ্ন মিজান নামের এক দোকানদার বলেন, সাড়ে ৩টার পর থেকে আন্দোলনকারীরা রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো গাড়ি যেতে দিচ্ছে না। অধিকাংশ মানুষ গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই যাতায়াত করছে।