কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার ইস্যুতে প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশ দুটির মধ্যে কোনো সংঘাত সৃষ্টি হোক এটা বাংলাদেশ চায় না। এদিকে ভারতের গুজরাটে হাজারের বেশি অবৈধ বাংলাদেশীকে গ্রেপ্তারের খবর আসছে গণমাধ্যমে। তবে এ বিষয়ে এখনো ভারত সরকার বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে কিছুই জানায়নি। এছাড়াও বাংলাদেশের স্বার্থে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তবে নন-স্টেট অ্যাক্টর হিসেবে আরাকান আর্মির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে পারে না। গতকাল রোববার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান কী এবং এর কোনো প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে কি না- সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমাাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট। আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি চাই। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বৈরিতা দীর্ঘদিনের। আমরা চাই না তাদের মধ্যে বড় কোনো সংঘাত সৃষ্টি হোক। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমরা চাইব আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সুরাহা হোক। ইতোমধ্যে মধ্যস্থতার কথা উঠেছে। যেভাবেই হোক উত্তেজনা প্রশমিত হোক- এটা আমরা চাই।

সৌদি আরব কিংবা ইরান মধ্যস্থতা করতে পারলে বাংলাদেশ কেন নয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমি মনে করি না এই মুহূর্তে আমাদের এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে তারা চাইলে আমরা সহায়তা করতে পারি। আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু করতে চাই না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশীরা গ্রেফতার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা এখন পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় দেখছি, অফিসিয়াল কিছু জানানো হয়নি। অফিসিয়াল জানালে দেখব। তাছাড়া তারা বাংলাদেশী কি না এটা প্রমাণসাপেক্ষ।

তৌহিদ হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় দেখেছি। এর বাইরে অফিশিয়াল কোনো যোগাযোগ আমাদের দেওয়া হয়নি। অফিশিয়াল যোগাযোগ দিলেও আমাদের দেখতে হবে তারা বাংলাদেশের লোকজন কিনা? যদি বাংলাদেশের লোকজন হয়, আমরা তাদের ফেরত নেব। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কিনা, এটা কিন্তু প্রমাণ করতে হবে। কারণ, আমরা জানি ভারতীয় কিছু বাংলাদেশী আছেৃবাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী হবে এমন নয়। বাংলাদেশীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দিল্লির বাংলাদেশের মিশনগুলো কোনো বার্তা দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, তারা কোনো কিছু নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

কাশ্মীরের ঘটনার পর বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশীদের গ্রেপ্তারের কথা শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য আছে কিনা, জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কোনোখানে পাই আমরা, তাহলে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারি। বৈধ ভিসা নিয়ে যারা যান, তারা ওখানে (ভারতে) সফর করে ফেরত চলে আসবেন। যদি তাদের কেউ আইন ভঙ্গ করে তাহলে সেটার জন্য তারা ব্যবস্থা নিতেই পারে। আমি মনে করি যাদের নিতান্ত প্রয়োজন নেই এই সংঘাতের সময় বরং এড়িয়ে যাওয়াই ভালো (ভারত সফর)। ভারতীয় পুলিশের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলার এক খবরে বলা হয়েছে, গুজরাট রাজ্যে অভিযান চালিয়ে ভারতীয় পুলিশ অবৈধভাবে বসবাসকারী ১ হাজার ২৪ বাংলাদেশীকে গ্রেপ্তার করেছে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা হলো পরে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত তো আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কারণ, মিয়ানমারের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী তো আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়ে আছে এবং তাদের আমরা ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছি। সেই ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যা কিছু প্রয়োজন, সেটা তো আমাদের করতে হবে। কারণ, আমাদের স্বার্থ সেখানে সংশ্লিষ্ট আছে।

তিনি বলেন, এখানে নন-স্টেট অ্যাক্টর আমাদের সম্পূর্ণ সীমান্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। নিজেদের স্বার্থে কোনোভাবে আমরা যোগাযোগ করতে পারি। তবে আমরা অবশ্যই অফিশিয়াল যোগাযোগ করতে পারি। কারণ, একটা নন-স্টেট অ্যাক্টরের সঙ্গে। কিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না, সেক্ষেত্রে যতটুকু প্রয়োজন সেটুকু আমরা নিশ্চয় করব।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক নাগরিকদের মানবিক সহায়তা দিতে ‘মানবিক করিডোর’ বিষয়ে নীতিগতভাবে রাজি আছে বাংলাদেশ। তবে এটি করতে হলে বাংলাদেশের দেওয়া শর্ত পালন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আমি এটুকু আপনাদের বলতে পারি, নীতিগতভাবে আমরা এ বিষয়ে সম্মত। এটা মানবিক সহায়তার চ্যানেল হবে। কিন্তু এটার ব্যাপারে আমাদের কিছু শর্তাবলি আছে। সেই শর্তাবলি পালিত হলে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।