ইবরাহীম খলিল : জাতির জীবনে একটি প্রহর এসেছিল ২০২৪ সালে, উল্লাসের প্রহর। তীব্র প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে পড়া মায়ের শরীর ভাঙচুর করে একটা নবজাতক পৃথিবীতে আসার পর মা যেমন তৃপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করে; তেমনি বন্দুকের গুলীর সামনে বুক চিতিয়ে দেওয়া আবু সাঈদ-মুগ্ধদের লাশ আর বহু তরুণের তাজা লহুর আর্তচিৎকার বুকে ধারণ করে নতুন স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করার উল্লাসের প্রহর। তখন মানুষের ঢল নেমেছিল রাস্তায়। স্বৈরাচারের বাসভবন গণভবন দখলে নিয়েছিল লাখো মানুষ। পুরো রাজধানীর অলিগলি ভরে গিয়েছিল উল্লাসে। সেদিন মানুষ দখল করতে গিয়েছিল স্বৈরাচারের নিশানা ডিবি অফিসের ‘হাউন আংকেলের ভাতের হোটেলও’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দুপুরের কথা বলছি। ওই দিনের সকালটা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। দুপুরের পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সেদিন তরুণেরা পেয়েছিল প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ। আর মুরুব্বীরা পেয়েছিল দ্বিতীয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির অনুভূতি। দিনটির ৬ মাস পূর্ণ হলো আজ। যেদিন ১৮ কোটি মানুষকে স্বপ্নের বিপ্লব এনে দিয়েছিল এদেশের ছাত্র-জনতা। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান থেকে শুরু করে স্বৈরাচারের বিদায় ঘন্টা বাজাতে পেরেছিল এই দেশের তরুণেরা। অত্যাচার, নির্যাতন, আন্দোলন আর বিজয়ের অংশীজনদের কাছে ঘটনা পরম্পরার কথা জানতে গেলে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন সবাই। বার বার বলে ওঠেন ওই সেইদিন, কয়েকদিন আগে স্বৈরশাসক খুনী হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া ছাত্রলীগ, যুবলীগের গুন্ডারা হেলমেট পরে নিরীহ শিক্ষার্থী আর ছাত্রীদের ওপর হামলে পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে। সেদিন ছিল ১৫ জুলাই ২০২৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের চিপায় ফেলে কি পৈশাচিক অত্যাচারটাই করেছিল ছাত্রীদের ওপর। সেদিন আহত হয়ে যারা ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছিল তারাও দ্বিতীয়বার ওই হায়েনাদের হামলার শিকার হয়েছিল। এসব নিপীড়ন থেকে রেহাই পেতে কত যে পলায়ন আর বাহানার আশ্রয় নিতে হয়েছে সমন্বয়কদের। কিন্তু তারা সরে আসেনি মূল জায়গা থেকে। আবু সাঈদ আর মুগ্ধদের রক্ত ঢেলে পিচ্ছিল করে দেওয়া পথেই হেঁটেছে দেশের তরুণেরা।
দিন, সপ্তাহ, মাস এভাবে ছয়টি মাস পার হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ এর সকাল বেলা যাত্রাবাড়ীর ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে কিংবা সাভারের মডেল থানার সামনে দিয়ে ঠেলাগাড়ি ভরে, পিকআপ ভ্যানে করে কিংবা ট্রাকে লাশ স্তূপাকার করে পেট্রোল দিয়ে জ¦ালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য কি চাইলেই ভুলা যায়? তেমনি ভুলা যায় না দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আন্দোলনকারীদের দেহ থেকে বুলেটের আঘাতে পিচঢালা রাস্তায় ঝরা ছোপ ছোপ রক্তের স্মৃতি। ভুলা যায় ৩৫ সহস্রাধিক মানুষের পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে কাতরানোর দৃশ্য? কারো কারো দুই চোখের আলো নিভে গেছে। কেউ হারিয়েছে একটি চোখ। হাত-পা হারিয়ে আজো কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বিছানায়। মেরুদন্ডে গুলী খেয়ে আজীবন বিছানার সঙ্গী হওয়া টকবগে কিশোরকে।
এতো গেলো স্বৈরাচারের নির্যাতন, আত্মত্যাগ আর স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগের কথা। এরপর! বাকী কথায় আসা যাক। বৈষম্যহীন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কথা বলে যে স্বাধীনতা এনে দিলো টকবগে তরুণেরা। সেই বাংলাদেশের খবর কী? সেদিন আর কত দূর? গণহত্যাকারীদের বিচার কতদূর? স্বৈরাচারের দোসরদের বিচার কতদূর ? ঘুরেফিরে একটি প্রশ্ন সবার সামনে আসছে তা হলো একজন পালালেও বাকী সব দোসর ঘাপটি মেরে আছে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পরতে পরতে। এই বিশাল সিন্ডিকেটের কী হবে? বলা হচ্ছে এদের দৌরাত্ম্যের কারণে প্রশাসনের কাজগুলো জটিল হয়ে যাচ্ছে। সেই সিন্ডিকেট দূর করতে না পারলে কাক্সিক্ষত দেশ নির্মাণ কঠিন হয়ে যাবে। তাহলে এসব দেখে কি এদেশের তারুণ্য বসে থাকবে অথবা যে তরুণেরা রক্ত ঢেলে স্বাধীনতা এনেছে তারা কি ঘুমিয়ে গেছে? না। ঘুমিয়ে যায়নি তরুণেরা। স্বৈরাচারের বিদায়ের পর আর কোন স্বৈরাচার জাতির বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসুক, এটা কারো কাছেই কাম্য নয়। বিগত ছয় মাসে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকার, শিক্ষাব্যবস্থাসহ জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর কাজ হয়েছে। সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে। এসব কাজ শেষ ও বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে আসলে কতটুকু এগুলো বাংলাদেশ। কতটুকু বৈষম্যমুক্ত হলো আমার প্রিয় মাতৃভূমি। আমরা কার নেতৃত্বে এগিয়ে যাবো ভবিষ্যতের দিকে। কোন ভাবনায় গড়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
বৈষম্য বিরোধীরা অবশ্য বলছেন, বিপ্লব শেষ হয়ে যায়নি। আবার জেগে উঠবে, কাংখিত বাংলাদেশ নির্মাণে। প্রত্যাশিত সময় এখনো আছে। বিপ্লবীরা তৈরি হচ্ছে। তাহলে কি বিপ্লবীরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার জন্য সত্যি তৈরি হচ্ছে!