মহান ভাষা আন্দোলনের অম্লান, অজেয় স্মৃতিবাহী মাস ফেব্রুয়ারির ১৯তম দিবস আজ বুধবার। দিকে দিকে এখন চলছে অমর একুশে উদযাপনের প্রস্তুতি। বনে বনে ফাল্গুনের রং লেগেছে, চলছে রক্তিম উৎসব। বসন্ত যেমন প্রকৃতির নবজাগরণের ‘ঋতু’ ফেব্রুয়ারি তেমনি নতুন দীক্ষা নেয়ার মাস। কোকিলের কুহুতান, পলাশ-শিমুলের রক্তলাল পুষ্পডালি যেমন পুরনো মনে হয় না, ফেব্রুয়ারির আবেদনও তেমনি কখনো ফুরিয়ে যায় না। তাই তো ভাষার মাসটি এলেই জেগে ওঠে প্রাণ। ফেব্রুয়ারি কেবল রোমান দেবতা ‘ফেব্রুস’-এর নামানুসারে রাখা ইংরেজি বছরের একটি মাত্র মাস নয়, গোটা দুনিয়ার তাবৎ মানুষের মধ্যে ভাষাপ্রেমের বীজমন্ত্র গ্রথিত হওয়ার সুবর্ণকালও বটে।
১৯৫২ সালের এই দিনে অর্থাৎ ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের খরচ জোগাতে দোকানে-দোকানে চাঁদা তোলার বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়। এসময় আবদুল্লাহ আল হারুনকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। যা চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল।
আন্দোলনের মূল দিনকে (২১ ফেব্রুয়ারি) সামনে রেখে চট্টগ্রামে নানা কর্মকা- পরিচালিত হয়। ১৯ এবং ২০ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন কর্মীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সারা রাত নগরীর বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়।
“যেসবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”Ñ মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের কাব্যগাঁথা মাতৃভাষাবিরোধী জন্ম নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি করে। যদিও সেই হাজার বছরের চর্যাপদ, মনসামঙ্গল, গীতগোবিন্দ, মৈমনসিংহ গীতিকা, পুঁথি সাহিত্য, গজল, বাউল গান, আলাওল, চন্ডীদাস, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ এবং সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদের প্রবহমান এবং শাশ্বত ঐতিহ্যের ধারায় আমরা অবগাহন করেছি বংশানুক্রমে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা ষোলয়ানা বাংলাভাষী সাজার চেষ্টা করি। এ কথা সত্য যে, ভাষা আন্দোলন তথা একুশের চেতনায় অনেকেই চলনে-বলনে বাংলাভাষী হতে সক্ষমতা অর্জন করেছেন।
বিগত ক’বছরের মতো মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে এবারও সরব আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। গণমাধ্যমগুলোর বাংলা বানানের হেনস্তাসহ ভাষার দুঃখগাঁথা নিয়ে অনেক বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ, টকশো ইতোমধ্যেই প্রকাশিত, প্রচারিত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই একটি প্রশ্ন জাগে, ভাষা শহীদ দিবসটি একুশে ফেব্রুয়ারি না হয়ে ৮ ফাল্গুনে পালন করা হয় না কেন? এর পাল্টা প্রশ্নও হতে পারে, ‘একুশে’ না হলে দিনটি সার্বজনীনতা পেতো? অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক-এটা কি কম অর্জন? এ বছরও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হবেÑ এটা বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে!
এদিকে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সালে ‘একুশে পদক’র প্রচলন করা হয়। এটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। দেশের বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক প্রদান করা হচ্ছে।