স্টাফ রিপোর্টার : মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন শ্রেনীর পরিবহন। এসব যানবাহনের মধ্যে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যান ও লেগুনা রয়েছে। এসব পরিবহনে প্রায় প্রতিদিনই সড়কে ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। সর্বশেষ ১৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় প্রাইভেটকারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জিহান নামের তিন বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে উপজেলার কর্নগোপ এলাকার রংধনু সিএনজি পাম্পে গ্যাস নেওয়ার সময় এ দূর্ঘটনা ঘটে। নিহত জিহান উপজেলার রূপসী নয়ানগর এলাকার শরীফ মিয়ার ছেলে

জানা গেছে, সারা দেশে অসংখ্য মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নিম্নমানের সিলিন্ডার ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনে চড়ছে যাত্রীরা। পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মালিক কিংবা চালকই এসবের কিছুই জানেন না। ঢাকায় চলাচল করা একেকটি গণপরিবহন যেন একেকটি চলমান বোমা। নিয়মিত গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার কারণে গণপরিবহনগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, দেশে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ২২৮। এর মধ্যে দেশে রূপান্তরিত যানবাহনের সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার ৬০৩টি। এ ছাড়া আমদানি করা টেক্সিক্যাব, বিআরটিসি বাস ও অটোরিকশার সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬২৫টি। এর বাইরে দেশে রূপান্তরিত অবৈধ লাখ কয়েক যানবাহন রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ছয় মাসে ৫০০-এর মতো পরিবহনের গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে অনেক পরিবহন আছে যেগুলো বছরের পর বছর পরীক্ষা করা হয় না। দেশে ৫ লাখ ৯ হাজার সিলিন্ডার ব্যবহারকারী পরিবহন রয়েছে। এর মধ্যে অনেক গাড়িতে দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করে। তার মানে পরিবহনে প্রায় ১০ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই রয়েছে ২ লাখ। এগুলোর ৬০ থেকে ৭০ ভাগই পুনঃপরীক্ষা করছে না মালিকরা। সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর রিটেস্টের বিধান রয়েছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের প্রফেসর ড. শামসুল হক গনমাধ্যমকে বলেন, সিএনজি চালিত যানবাহনের বিষয়ে আরো বেশি দায়িত্বশীল তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমরা লক্ষ করি ঢাকায় যেসব সিএনজি পুরোনো হয়ে যায় এর অনেকগুলো আবার গ্রাম এলাকায় ব্যবহার করে এতেও কিন্তু ঝুঁকি রয়ে যায়। এগুলো ব্যবহারে ঝুঁকিতে ফেলেন সাধারণ মানুষকে। এসব নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কঠোর হয়ে কাজ করতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ১২৫টি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গত বছর প্রায় অর্ধশত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাভারে অ্যাম্বুলেন্স ও বেপরোয়া বাসের সংঘর্ষে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকন্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা চারজন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এ বিস্ফোরণে পেছনের একটি বাসে আগুন লেগে সেটিও পুড়ে যায়। এই ঘটনায় তিনটি পরিবহন পুড়ে যায়। লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের মুক্তিগঞ্জ এলাকার গ্রিন লিফ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গত ১১ ডিসেম্বর একটি বাসে গ্যাস রিলিপের সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরও তিনজন। একই ফিলিং স্টেশনে গত বছর ১৩ অক্টোবর একটি যাত্রীবাহী বাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হন তিনজন। আহত হন ২০ জন।

এ ছাড়া গত ৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে কিশোরগঞ্জের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে প্রকৌশলী ও চালক আহত হন। এরকম প্রতি বছর যাত্রীবাহী বাস, সরকারি প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে শত শত মানুষ মারা যান। এই ঘটনায় অনেকের হাত-পাসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গহানি হয়ে থাকে।

গত ১৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার সময় প্রাইভেটকারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জিহান নামের তিন বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রূপগঞ্জের ্হনংঢ়;রূপসী থেকে নরসিংদীর সাহেপ্রতাব যাওয়ার পথে কর্ণগোপ এলাকার রংধনু সিএনজি পাম্পে প্রাইভেটকারে গ্যাস নেওয়ার সময় সিএনজি ডেলিভারি নজেলের পাইপ লিকেজ থেকে প্রাইভেটকারের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। আগুনে পুরো প্রাইভেটকারটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রাইভেটকারে ভিতরে থাকা শিশু জিসানের মৃত্যু হয়

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার সময় সবচেয়ে জরুরি যে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো গ্যাসটা যেন লিকেজ না হয়ে যায়। কারণ গ্যাস ভরার সময় লিকেজ হয়ে চারপাশে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। সেটাই বিস্ফোরণ হয়। প্রচলিত জ্বালানির চেয়ে অর্ধেক বা এরও কম খরচে এই জ্বালানি ব্যবহার করা যায়। তাই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অনুমোদিত এবং অননুমোদিত সিএনজি রূপান্তরের বহু প্রতিষ্ঠান। রয়েছে অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগও, যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম আনছারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, যেসব সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ, সেগুলো বাদ দেওয়া উচিত। এখন কেউ যদি বাদ না দিয়ে ব্যবহার করেন, তবে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দুর্ঘটনা এড়াতে সব পক্ষকে সতর্ক হতে হবে। বেশি সচেতন হতে হবে ব্যবহারকারীকে। আমাদের পক্ষ থেকে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। শুধু বিস্ফোরণ অধিদপ্তর নয়, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল), বিআরটিএ, ব্যবহারকারী, ট্রাফিক ব্যবস্থা সবাইকে সমন্বয় করে সিলিন্ডার ব্যবহারে সচেতন করতে হবে। তিনি বলেন, মানুষ যদি সতর্কতার সঙ্গে নিয়ম মেনে সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তবে দুর্ঘটনা ঘটবে না।