মুহাম্মদ নূরে আলম: তাহমিদ ভুঁইয়া তামিম মাত্র পনের বছর বয়সে তার ভালো-মন্দ বুঝ-জ্ঞান হওয়ার আগেই শহীদ হয়ে গেল। সে এই অল্প বয়সের মধ্যেই জীবনটা স্যাক্রিফাইস করে ফেলল দেশের জন্য! কিশোর তাহমিদের স্বপ্ন ছিল সেরা ক্রিকেটার হবে। বিশ্ব জয় করবে। তাহমিদ ভুঁইয়া তামিম ক্রিকেট খেলতে খুব ভালোবাসতো। স্বপ্ন দেখতো দেশের স্বনামধন্য ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার এবং নিজেকে দেশের একজন বড় ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের গুলীতে মুহূর্তেই ঝরে গেল কচি প্রাণ। নিভে গেল জীবন প্রদীপ। অধরাই থেকে গেল তাহমিদের সেরা ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। তামিমের মৃত্যুর পর তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাহমিদদের বাড়ি শহীদ হওয়ার ঘটনাস্থল জেলখানার মোড় থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে। টিনশেড পাকা বাড়িতে বসবাস করে তাহমিদের পরিবার। শহীদ তাহমিদ তামিম নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পল্লী চিকিৎসক বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও গৃহিণী মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিল তামিম। তাহমিদ ছোট থেকেই মেধাবী ছিল। সে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়তো। সর্বশেষ নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি সবসময় ক্রিকেট খেলা নিয়ে মেতে থাকতো। উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নরসিংদীর রাজপথে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জন গুলীবিদ্ধ ও দুই জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে গুলীবিদ্ধ হয়ে সর্বপ্রথম শহীদ হন স্কুল পড়ুয়া নবম শ্রেণির ছাত্র তাহমিদ ভূঁইয়া। ছাত্র-জনতা শহীদ তাহমিদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে নরসিংদীর জেলখানা মোড়কে ‘তাহমিদ চত্বর’ নামে ঘোষণা করে।
নতুন প্রজন্মের কিংবদন্তী: ১৮ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার। পরিবারের সবাই একসাথে দুপুরে ভাত খায়। তাহমিদ কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াতও করে। ‘বাবা, কিছুক্ষণ শুয়ে থাকো’ এ কথা বলে তাহমিদের বাবা পাশের রুমে শুতে যান। তাহমিদ আর ছোট বোন লিনাত একসাথে খাটে শুয়ে মোবাইলে নিয়ে খেলেছিল। মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে গেলে তাহমিদ ফোনটা চার্জে লাগিয়ে ঘরে বাইরে এসে কিছুক্ষণ আনমনে বসে থাকে। ছোটবোনও বাইরে আসে। আবারও ভাইয়ের দুষ্টামি করতে থাকে। তাহমিদ কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকে। মা তখন রান্নাঘরে ছিল, কাছে গিয়ে মায়ের সাথে গল্পসল্প করে। কথার ফাঁকেই তাহমিদ মাকে বলে, ‘তুমি আমাকে ঢাকায় যাইতে দাও না, মেয়ে মানুষের মতো ঘরে বসাই রাখো’! মায়ের সঙ্গে এই শেষ কথা তার। বাবা তখন পাশের রুমে ঘুমাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর মা বাজারে গেলে তাহমিদ ঘর থেকে বের হয়ে চলে যায় নরসিংদী জেলখানা মোড়ে আন্দোলনে। বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদী শহরের জেলখানার মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছিল।
তাই তাহমিদকে রাস্তার দিকে যেতে দেখে পাড়ার এক প্রতিবেশী নারী নিষেধ করেন সামনে না যেতে, গ্যাঞ্জাম চলতেছে ছাত্র-পুলিশের মধ্যে। তাহমিদ প্রতিবেশির কথায় কর্ণপাত না করেই ছুটে যায় সামনে, কী হয়েছে একটু দেখে আসতে। বেলা তখন প্রায় ৪টা ছুঁই ছুঁই। উত্তপ্ত নরসিংদী জেলখানা মোড়। একদিকে পুলিশের গুলীবর্ষণ, অন্যদিকে উপস্থিত ছাত্র-জনতার ইটপাটকেলে প্রতিরোধ হামলা। তাহমিদও এসে ঢুকে পড়ে আন্দোলনকারীদের সাথে। পুলিশের ছোঁড়া গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাহমিদের বুক। গুলী লেগে মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়ে যায় তাহমিদ। রক্ত ঝরতে থাকে তার শরীর থেকে। আশপাশের ছাত্র-জনতা তাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় নরসিংদী জেলা হাসপাতালে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ততক্ষণে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে নেয় তাহমিদ। হাসপাতালে থাকা উপস্থিত ছাত্র-জনতা লাল-সবুজের পতাকা মুড়িয়ে হাসপাতালের স্ট্রেচারসহ তাহমিদের লাশ নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটে। মিছিল বের করে ‘আমার ভাই মরল কেন, পুলিশ তোমার জবাব চাই’...। স্লোগানে স্লোগানে যখন লাশসহ মিছিল নিয়ে হাসপাতাল থেকে স্টেডিয়াম ফটক দিয়ে জেলখানা মোড়ের দিকে আগায়, ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে পুলিশ আবারও শুরু করে বৃষ্টির মতো গুলীবর্ষণ। সামনে স্ট্রেচারে পড়ে থাকা তাহমিদের নিথর দেহে অনবরত গুলী লাগতে থাকে। (ঐ সময়ে স্পটে ইমন নামে আরেকজন পুলিশের গুলীতে শহীদ হন।)
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নরসিংদী শহরের জেলখানার মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছিলো। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মাঝখানে পড়ে তাহমিদ। পুলিশের গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার বুক। ঘটনাস্থলেই মারা যায় তাহমিদ। তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা তাহমিদের লাশ ছিনিয়ে নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ নরসিংদীর রাজপথে মিছিল করে। এ সময় শহীদ মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামের মূল ফটকের শহীদ মিনারের সামনে আন্দোলনকারীরা স্বৈরাচারবিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে। পুলিশ তাহমিদের লাশের ওপর গুলী চালায়। তামিমের ফুফা লুৎফর রহমান বলেন, তাহমিদ ছোট থেকেই মেধাবী ছিল। সে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়তো। পরে তার মধ্যবিত্ত বাবার পক্ষে সেই খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারায় তাকে এনকেএম স্কুলে ভর্তি করায়। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট ভালোবাসতো। সে ভালো খেলতোও। স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ার, তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তাহমিদের বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, মৃত ছেলের লাশের উপরও অনবরত গুলী লাগতেছে, একজন অসহায় বাবা সেই দৃশ্য দূর থেকে দেখতেছেন একবার কল্পনা করুন তো ব্যাপারটা! ছেলের লাশে গুলীর দৃশ্য দেখে বুকে ভীষণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল আমার, আমি চিৎকার করতে করতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি প্রায়। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীরা আত্মরক্ষার্থে লাশ ফেলে আমাকে টেনে নিয়ে নিকটবর্তী মসজিদে ঢুকে পড়ে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আন্দোলনকারীদের সহায়তায় লাশ নিয়ে বাড়িতে ফিরি। পরে ময়নাতদন্ত ছাড়া বৃহস্পতিবার রাতেই ছেলের বিদ্যালয় ও চিনিশপুর ঈদগাহে দুই দফা জানাযা শেষে এলাকার স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করি। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশের ময়নাতদন্ত করার জন্য বলা হলেও আমি রাজি হইনি। সবার সামনেই গুলী করে ছেলেকে মারা হয়েছে, ময়নাতদন্ত করে আর কী হবে? আমার ছেলেকে তো আর ফেরত পাব না।
নরসিংদীর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, রাবার বুলেটবিদ্ধ তাহমিদকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে এনেছিলেন শিক্ষার্থীরা। রাবার বুলেটে বিদ্ধ বুক ঝাঁঝরা হয়ে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। তাকে মৃত ঘোষণা করার পরপরই উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল থেকে তাকে নিয়ে চলে যায়। আমরা চেয়েছিলাম, তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠাতে। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে সেটা করা সম্ভব হয়নি।
তার বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, পড়ালেখার পাশাপাশি ক্রিকেটের ভক্ত ছিল তাহমিদ। ক্রিকেট পাগল তাহমিদ লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা নিয়ে মেতে থাকতো। স্বপ্ন দেখতো দেশের স্বনামধন্য ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি হবে। নিজেকে দেশের একজন বড় ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলবে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তিনি আরও জানান, একমাত্র ভাই তাহমিদের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে ছোট বোন লিনাত ভূঁইয়া (১৩)। সারাক্ষণ ভাইয়ের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকে। মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে গেছে তার।
তাহমিদের বাবা আমাকে বলেন, পুলিশ নাকি এখনও বিভিন্নভাবে ঝায়-ঝামেলা করতেছে। মামলার এজাহারে নিজেদের দায়মুক্তি দিয়ে কয়েক হাজার মানুষের নামে অজ্ঞাত মামলা দিচ্ছে নিজেরা বাদী হয়ে। “পুলিশ আমার ছেলের লাশ কবর থেকে উঠাতে চাইলে আমরা বাধা দিই। পরে আমাকে বলা হয় স্টেটমেন্ট দিতে। আমি সেদিনের উপস্থিত মানুষের বরাতে বর্ণনা দিই। লেখা হয়। সন্ধ্যায় আবার কল করে বলে, লেখায় একটু কাটাকাটি হইছে তো সংশোধন করতে আপনাকে আসতে হবে। তখন মাগরিবের আযান চলে, আমি তৎক্ষণাৎ সেখানে যাই। গেলে তারা একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে এখানে সাইন করতে। আমি পড়ে দেখি, সেখানে পুলিশ বাদী হয়ে সাধারণ মানুষের নামে অজ্ঞাতনামা মামলা করেছে। লেখা হয়, পুলিশের উপর হামলা, গোলাবারুদ লুটপাট করা হয়, সেখানে দুষ্কৃতিকারীদের গুলীতে তাহমিদ মারা যায়। আরও একটা ছেলে মারা গেছিল, ওর নামও সেখানে থাকে। দেখলাম, সেখানে অনেক ধারা। সম্ভবত ৭-৮টা ছিল। আমি তো মামলা মোকদ্দমা নিয়ে এতো কিছু বুঝি না। পরে আমি ঐখানে সাইন করতে রাজি হই নাই। আমি স্পষ্ট বলি, আমার ছেলেকে পুলিশ প্রকাশ্য দিবালোকে গুলী করে হত্যা করেছে, যার ভিডিও, ছবি সবকিছু আছে। সেদিন ত পুলিশের গোলাবারুদ লুটপাট, তাদের উপর হামলা কিছুই হয়নি। আমার ছেলে এসবে জড়িতও নয়। ও নাবালক। আমি কেন স্বাক্ষর করব এসব বর্ণনায় স্টেটমেন্ট দিয়ে। আমাকে চাপ দেয়া হয়। আমি বলি, কোনো অবস্থাতে আমি সাইন করব না। ডিসি আমাকে বলে, তাহলে কী বলতে চান আপনি? আমি একই কথা বলি।”