মুহাম্মদ নূরে আলম: ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলন ও গণবিপ্লবের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে তিনি বক্তব্য দেন। আর এটিকে কেন্দ্র করে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এই নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আবারও কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ কিছুদিন শিথিল থাকার পর ফের বাড়ছে ঢাকা-দিল্লী কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য রাখাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি উত্তাপ ছড়ায়। হাসিনার বক্তব্যকে বানোয়াট ও উস্কানিমূলক অভিহিত করে ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়াও তলব করা হয় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে, তাকে জানানো হয়, হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড। দেশে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগেও হাসিনাকে অভিযুক্ত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য ফেরত পাঠানোর অনুরোধ পেলেও এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কৃতি বর্ধন সিং। গত বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার অধিবেশনে জন বৃত্তাসের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য তুলে ধরেন তিনি। লিখিত প্রশ্নে রাজ্যসভার সদস্য জন বৃত্তাস জানতে চান, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে কি না; চেয়ে থাকলে তারা কারণ হিসেবে কী বলেছে এবং ভারত সরকার তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে কি না। জবাবে কৃতী বর্ধন বলেন, বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। খবর এনডিটিভি ও বিবিসি। এছাড়াও এবিষয়ে গতকাল শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী শেখ হাসিনা যেন বক্তব্য না দেন, সেজন্য ঢাকার ভারতীয় ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধেকে তলব করে প্রতিবাদ নোট দেওয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। এতে করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আবারও বেড়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতকে আমরা লিখিতভাবে অনুরোধ করেছি শেখ হাসিনাকে সংযম করার জন্য, যেন উনি এ ধরনের বক্তব্য না দেন; যেটা বাংলাদেশের বিপক্ষে যাচ্ছে। আমরা এটার কোনো জবাব পাইনি এখনও। গত কয়েকদিনের কার্যকলাপের কারণে আজ আরেকবার তাদের প্রতিবাদ নোট দিয়েছি। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রদিবাদ নোটটি দিয়েছি এবং আমরা আবারও অনুরোধ করেছি, যেন তাকে থামানো হয়। ‘কারণ তার যে বক্তব্য প্রধানত মিথ্যা। উনি যেসব কথা উল্লেখ করছেন সেটা এক ধরনের অস্থিশীলতা উসকে দিচ্ছে বাংলাদেশে। এজন্য আমরা অনুরোধ করেছি এই অনুশীলনটা বন্ধ করার জন্য।

প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে কূটনৈতিক পত্র দিয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছে এতে কাজ না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাহলে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপে কখন যাবে এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতকে আমরা অনুরোধ করেই যাচ্ছি তাকে যেন এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়। আমরা দেখব, কি ঘটে এবং কতটুকু তারা পদক্ষেপ নেন সেই অনুযায়ী আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব। ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে সহযোগিতা বা মদদ পাচ্ছেন কিনা-জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, এটার জবাব দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। আমার মনে হয় ভারতীয়রা আরও ভালো জবাব দিতে পারবেন। তারা আমাদের জানিয়েছেন, তারা তাকে কোনো প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছেন না। কিন্তু উনি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এটা করছেন এবং যে প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন সেগুলো আন্তর্জাতিক, আমেরিকা ভিত্তিক ইত্যাদি। এটা হলো ভারতের অবস্থান।

গত বৃহস্পতিবার ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধের কাছে দেওয়া প্রতিবাদ নোটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “গভীর উদ্বেগ, হতাশা এবং গুরুতর আপত্তি” প্রকাশ করেছে। হাসিনার বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য-বিবৃতিগুলো ঢাকা-দিল্লির মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সহায়ক নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এতে। এছাড়া ভারতে থাকাকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে হাসিনাকে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত রাখতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মনোভাব নিয়ে অবিলম্বে এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারতকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, হাসিনার বিষয়ে ভারত কী পদক্ষেপ নেয় তা আমরা পর্যবেক্ষণ করব।

এদিকে ভারত মুজিবের স্মৃতি যাদুঘর ধ্বংসের ‘কঠোর নিন্দা’ জানিয়েছে। একে ‘ভাঙচুর’ বলে অভিহিত করেছে ভারত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্রিফিংয়ে বলেছে- যারা স্বাধীনতা যুদ্ধকে মূল্যায়ন করে, বাংলা পরিচয়কে লালন করে, তারা এই বাড়ির গর্বিত গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত। ভারতে অবস্থানকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো চ্যানেলের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ‘মিথ্যা ও উস্কানিমুলক’ বিবৃতি বন্ধ করতে দুদেশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার ভিত্তিতে ভারতকে অবিলম্বে ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

৫ আগস্টের পর দিল্লির সঙ্গে টানাপোড়েন নিরসনের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক। ওই বৈঠকের সুফল আসবে কি না, সেটি বোঝা যাবে আরও পরে। কোনো কারণে যদি ইতিবাচক কিছু নাও হয়, অন্তত দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে; হয়ত রাজনৈতিক দূরত্ব থাকবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন কমাতে চলতি মাসে ঢাকায় বৈঠকে বসেছিলেন দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবরা। টানাপোড়েন আর আস্থার সংকট কাটাতে পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিন ও ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঐকমত্য হয়েছেন। তবে, বিজয় দিবসের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিতর্কিত পোস্ট ভালোভাবে নেয়নি ঢাকা। এটি ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কের জোড়া লাগানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের বার্তা দিচ্ছে।