স্টাফ রিপোর্টার : আগামীতে আইনকানুন এবং সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে কেউ জিতলে পরাজিত বা অন্যরা আর সন্দেহ করবে না। ভাববে না যে, কলকাঠি নেড়ে কাউকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠন হবে তার ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। সেটার ব্যাপারে আইনকানুন সবার জানা থাকবে, এটা নড়চড় করার উপায় কারো থাকবে না। আইনকানুন বানানোর পরে সেটা নড়চড় করার সুযোগ থাকবে না, সেজন্যই এত বড় কমিশন করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এই যে আইনকানুন, নীতিমালা বানিয়ে দেব। একবার বানিয়ে দিলে তারপর থেকে চলতে থাকবে। একটা ট্র্যান্সপারেন্ট খেলা হবে। খেলায় জিতলে কেউ সন্দেহ করবে না যে কেউ জিতিয়ে দিয়েছে। এতো ট্রান্সপারেন্ট যে, কেউ সন্দেহ করবে না।
ড. ইউনূস বলেন, এখন যে খেলা চলছে, ঠিকমতো জিতলেও সন্দেহ করে। বলে কিছু একটা কলকাঠি নেড়ে করেছে। এই কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি আমাদের মনের ভেতর গেঁথে গেছে। কলকাঠি ছাড়া যে দেশ একটা নিয়মে চলতে পারে সেটা আমরা ভুলে গেছি।
সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এটা সবার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন আমরা এমন মজবুতভাবে বানাব যা সবাই মেনে চলবে। এই মেনে চলার মাধ্যমে আমরা একটা সুন্দর সমাজ, সুন্দর রাষ্ট্র উপহার দিতে পারব। সেই উদ্দেশ্যেই আজকের সভা।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রচণ্ড সুযোগ এখন। সুযোগ এজন্যই যে, আমাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হলে আমরা সেগুলো কাজে লাগাতে পারি এমন পর্যায়ে আছি আমরা। একবার কাজে লাগালে সেটা বংশ, প্রজন্ম ও পরম্পরায় সেটা চলতে থাকবে। একটা সুন্দর দেশ আমরা পাব। এই ভাবনা থেকেই আমরা এগুলো গ্রহণ করব। অন্তর্র্বর্তী সরকারের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের ছয় মাসে প্রথম ইনিংস বা প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। আজ রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো। আলোচনাটা কত সুন্দর হবে, কত মসৃণ হবে সেটা আপনাদের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা সুপারিশগুলো উপস্থাপন করবো। কমিশনের সদস্যরা এখানে রয়েছেন এগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য, চাপিয়ে দেওয়ার জন্য না। চাপানোর ক্ষমতা আমাদের নাই। আমরা শুধু আপনাদের বোঝানোর জন্য।
সংস্কার বাস্তবায়ন সবার দায়িত্ব উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আপনাদের সহযোগিতা চাই এটা বলব। কারণ, এটা আপনাদের কাজ। এটা আমার কাজ না, একার কাজ না। যেহেতু আপনারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন আপনাদের বলতে হবে সমাজের কল্যাণে কোন কোন জিনিস করতে হবে, কীভাবে করতে হবে। যেটা এক্ষুণি করা যাবে বলবেন। যেটা এক্ষুণি করা দরকার, সামান্য রদবদল থাকলে সেটা করে দেন। আমরা শুধু সাচিবিক কাজগুলো আপনাদের করে দিলাম।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা একটা লন্ডভন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছি। চেষ্টা করেছি এটাকে কোনোরকমে সফল করতে। এই ৬ মাসের যে অভিজ্ঞতা সেটা আমাদের সবাইকে প্রচণ্ড সাহস দেবে। এই ৬ মাসের অভিজ্ঞতা হলো, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ সবাই সমর্থন দিয়েছে এই অন্তর্র্বর্তী সরকারকে। কাজেই আমরা প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বে এলাম। দ্বিতীয় পর্বে যেন আমরা আনন্দের সঙ্গে, খুশি মনে সম্পন্ন করতে পারি।
সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি, এবি পার্টি, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (আন্দালিব পার্থ) ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট,গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (জে এসডি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণফোরাম, আম জনতার দল, ন্যাপ ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স এবং বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন।
আসরের নামাযের বিরতিতে মিটিং থেকে বের হয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, যতগুলো দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম সবাই এসেছেন। বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। আজকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূস বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৬ মাসের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছে। আজকের ডায়ালগের মাধ্যমে দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু হলো। তিনি এই সংলাপকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, আমরা যেই বাংলাদেশকে গড়তে চাচ্ছি, তার প্রতি পুরো দেশ এবং আন্তর্জাতিক সবার সমর্থন আছে। আন্তর্জাতিক যতগুলো বড় বড় দেশ আছে, তারা বলেছেন তোমাদের কী চাই ? আমরা তোমাদের সাথে আছি। একইসাথে জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন আছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কমিশনের যে রিপোর্ট আসলো, তাতে পুরো পৃথিবী জানতে পেরেছে, কী ভয়ানক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে। কে অর্ডার করেছিল এবং কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার হরণ করেছিল। এরপর গণঅভ্যুত্থানের পরে নতুন যে বাংলাদেশ গড়তে যাচ্ছি, তার সাথে পুরো পৃথিবী এবং বাংলাদেশের সবাই আছে। আজকে একটা বড় উদ্যোগ শুরু হলো। এই দ্বিতীয় যাত্রার মাধ্যমে কী রকম বাংলাদেশ আমরা চাই, সেটা নির্ধারিত হবে।
প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তিনি (ড. ইউনূস) আহ্বান জানিয়েছেন যে, সংস্কারের যে রিপোর্টগুলো প্রত্যেকটি কমিশন দিলে সেগুলোর ওপর আলাপ-আলোচনা হবে। দলগুলো এটা নিয়ে কমিশনের সঙ্গে কথা বলবে এবং একটা ঐকমত্য পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। সেজন্য আজকে প্রাথমিক আলোচনা সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতামত দিয়েছেন।
৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সাবেক সংদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। অন্যদের মধ্যে দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পারওয়ার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মশিউল আলম। সংলাপ থেকে বের হয়ে ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আজ রিফর্ম কমিশনের যারা সদস্য ছিলেন তাদের সাথে বৈঠক হয়েছে। ওনারা কিভাবে এটা করবেন এবং বিভিন্ন দলের সাথে এবং অংশীজনের সাথে ভালভাবে আলোচনা করবেন, সেবিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছি এবং সকল পজেটিভ সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামী স্বাগত জানাবে। আমরা এও বলেছি, এই সংস্কার কমিশন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার পরে যথা শিগগরিই সম্ভব যাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেই প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য। আজকে মূলত এটাই ছিল আমাদের আলোচনা। আর ডিটেলসটা আমাদের বই দিবেন। তারপর তা ডিসকাশন করে তার সাথে আলাদা বৈঠক হবে। সেখানে আমাদের মূল সিদ্ধান্ত জানাবো। এটাই আজকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
ব্যর্থ হলে জাতি ক্ষমা করবে না- আলী রীয়াজ
বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথরেখা তৈরিতে ব্যর্থ হলে জাতি ক্ষমা করবে না। নতুন বাংলাদেশের পথরেখা তৈরির প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এ কাজে ব্যর্থ হলে জাতি আমাদের ক্ষমা করবেন না। দীর্ঘদিন সংগ্রাম ও অনেক প্রাণের বিনিময়ে আমরা এখানে এসেছি। ছয়টি কমিশনের প্রস্তাবে সেই পথরেখার কথা উল্লেখ আছে। এখন আমাদের কাজ সুপারিশের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি, বাস্তবায়নের পথ-পদ্ধতি তৈরি করা।
রাষ্ট্রের সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুরু না করলে সেই প্রক্রিয়া অগ্রসর হবে না। প্রক্রিয়া অগ্রসরে সকলের ঐকমত্য জরুরি বলেও জানান আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ঐকমত্য করতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দলগত ও জোটগত বৈঠক করব। কিন্তু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকা। বিভিন্ন সময়ে আমরা আবারও মিলিত হব।
আলী রীয়াজ বলেন, আমাদের লক্ষ্য যেহেতু এক, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদ্ধতির সংস্কার করা এবং দ্রুততর সময়ে নির্বাচন করা। তাই আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের পাশাপাশি বোঝাপড়া তৈরি ও একত্রে কাজ করা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সেই সহযোগিতা পাবেন বলে মনে করেন আলী রীয়াজ। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সনদ তৈরি করা সম্ভব হবেও বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলী রীয়াজ বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে আপনাদের সহযোগিতা করা, সকলের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সনদ তৈরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা ও যত দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়া। এমন দলিল তৈরি করা যাত নতুন বাংলাদেশের প্রথম রেখা তৈরি করা যাবে।