মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সারাদেশে সহিংসতা উস্কে দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছে প্রায় সব দলই। তারা বলছেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সারাদেশে সংঘটিত সহিংসতার জন্য পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনাই দায়ী। অন্যদিকে দেশের বিশিষ্টজনরা বলছেন, জুলাই-আগস্টসহ গত দেড় দশকে যে নারকীয় তান্ডব চালানো হয়েছে সেই গণহত্যার দায় আওয়ামী লীগ স্বীকার না করলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবারো ঘটতে পারে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ ধরনের ঘটনা উস্কে দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছে প্রায় সব দলই। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করেছেন কেউ কেউ।
দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি বলছে, এত মানুষের মৃত্যু ও ১৫ বছরের নির্যাতনের ক্ষোভ মানুষের মধ্যে জমে ছিল। এ ঘটনায় আরও একবার মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে রাজনীতির মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত বলে মনে করছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়া কাম্য নয় বলেই মত দলটির।
এই ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। তারা বলছে, গণহত্যার দায় স্বীকার না করলে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। সামনেই নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণার কথা রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির। তবে বিশৃঙ্খলার জন্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নাগরিক ঐক্য ও গণঅধিকার পরিষদ। এই ঘটনায় সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেই মত দল দু’টির।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পর গত বুধবার রাতভর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বুলডোজার দিয়ে ভবনটির একাংশ ভেঙে দেয়া হয়। যেসময় এই ভাঙচুর চলছিল তখন পূর্বনির্ধারিত এক ভার্চুয়াল ভাষণে এর সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, যিনি গত পাঁচ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। গত বৃহস্পতিবার সকালেও ভবনটিকে বুলডোজার দিয়ে ভাঙতে দেখা যায়। দুই দিনই হাজারখানেক উৎসুক জনতা ভবনটির সামনে জড়ো হয়েছেন। এসময় অনেককেই ভবনের ইট, রড খুলে নিতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বলছে, হাসিনা যে অন্যায় করেছে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করেছে, তার প্রতিবাদে তারা ভবনের এসব অংশ খুলে নিচ্ছে। কেউ কেউ বলছে, দম্ভের পতনের স্মৃতি হিসেবে তারা ইট কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হবার ছয় মাস পর ছাত্রসমাজের উদ্দেশে মঙ্গলবার শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন এমন খবর আসার পর থেকেই এনিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শেখ হাসিনা বক্তব্য দিলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভবনে ভাঙচুর চালানো হবে উল্লেখ করেও সামাজিক মাধ্যমে নানা পোস্ট দেয়া হয়। ধানমন্ডিতে থাকা শেখ হাসিনার আরেকটি বাসভবন সুধাসদনেও হামলা চালানো হয়। এছাড়া খুলনা, কুষ্টিয়া, ভোলা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ত্রিশাল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে। মূলত এর অধিকাংশ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের মুর্যাল।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সারাদেশে ভাঙচুরের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, গড়ার তাকত আছে আমাদের?" শিরোনামে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন। লম্বা পোস্টের একটি অংশে তিনি লিখেছেন, ভাঙ্গার পরে গড়ার সুযোগ এসেছে, কিন্তু অনন্ত ভাঙ্গা প্রকল্প আমাদের জন্য ভালো ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবহ নয়। গড়ার প্রকল্পগুলো খুব দ্রুতই শুরু ও বাস্তবায়ন হবে। আপনারা গড়ার কাজে সক্রিয় হন।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের ফেসবুক পেইজে লেখেন, আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্ত হবে। পরে রাত পৌনে ১০টার দিকে তিনি লেখেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। রাত ১১টার দিকে দেয়া এক পোস্টে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম লেখেন, আবু জাহেলের বাড়ি এখন পাবলিক টয়লেট!
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শক্তভাবে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেছে, পলাতক অবস্থায় ভারতে বসে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে জনমনে গভীর ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য ভারতকে লিখিতভাবে বলা হয়েছে এবং তাদের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে তা বলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে তিনি একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসে জামায়াতের আমীর সার্বিক পরিস্থিতির জন্য পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উস্কানিই মূলত দায়ী বলে উল্লেখ করেন। এতে ডা. শফিকুর রহমান লিখেছেন, মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনা কখনোই বাংলাদেশের মানুষকে অন্তরে ধারণ করে না। এটি তার ঘৃণিত স্বভাব। দেশবাসীকে কোনো ধরনের উস্কানিতে পা না দিয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
স্ট্যাটাসে জামায়াত আমীর আরও লিখেছেন, বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক দায়িত্বশীল নাগরিকবৃন্দের প্রতি আহ্বান- কোনো উস্কানিতে পা না দিয়ে ধৈর্য ধরুন এবং প্রিয় দেশকে ভালোবাসার নমুনা প্রদর্শন করুন।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা আজকে ছাত্রলীগের ব্যানারে জাতির সামনে ভাষণ দিয়েছে। যে আমাদের ভাইদের গুলী করে দেশ থেকে পালিয়েছে, সে কী করে কর্মসূচি ঘোষণা করে। আমরা এ দেশে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার কোনো অস্তিত্ব রাখব না। যারা ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেসব ফ্যাসিবাদীদের কোনো চিহ্ন বাংলাদেশের মাটিতে রাখতে চাই না। অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বিএনপি বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আমাদের আহবান, পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন। অন্যথায় দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির প্রসার ঘটবে। সুতরাং কঠোরভাবে আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান করা এখন সময়ের দাবি।
তবে বিবৃতিতে বলা হয়, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার এবং তার দোসরদের উস্কানিমূলক আচরণ, জুলাই আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে অশালীন এবং আপত্তিকর বক্তব্য মন্তব্য দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং ক্রোধের জন্ম দিয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে গত বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত স্বৈরাচারের স্মৃতি, মূর্তি, স্থাপনা ও নামফলকসমূহ ভেঙ্গে ফেলার মতো জনস্পৃহা দৃশ্যমান হয়েছে। বিএনপি মনে করে, পতিত ফ্যাসিস্ট এবং স্বৈরাচারের স্মৃতিচিহ্ন নিশ্চিহ্ন কিংবা নির্মূলের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন নিহিত নয় বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শিক চিন্তা, শক্তি ও প্রভাবের আদর্শিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঐক্যকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়া এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাই উত্তম পন্থা।
সারাদেশে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনাবলী ‘কোনোভাবে কাক্সিক্ষত নয়’ মন্তব্য করে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, জনগণের অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্যে জনগণের ভেতরে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তার ফলে এসব ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের এই প্রক্রিয়া আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে সুগম না করে বরং তাকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভারতে বসে শেখ হাসিনা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ষড়যন্ত্র করছে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে বসে এদেশকে আনস্টেবল সিচ্যুয়েশনে নেবার জন্য, এদেশকে ধ্বংস করতে যেটুকু তিনি বাকি রেখেছেন সেটি পূর্ণ করার জন্যে নতুন ভাবে এই ফ্যাসিস্ট দল(আওয়ামী লীগ) কে নিয়ে মাঠে নামতে চান।