স্টাফ রিপোর্টার : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া গভীর ক্ষত সহসাই নিরসন হচ্ছে না। বিগত সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে আসন্ন গরম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি থাকছে। ফলে আসন্ন গ্রীস্মে বিশেষ করে রমযানে দেখা দিতে পারে লোডশেডিং। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা পল্লী বিদ্যুতে দায়িত্বরতরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করার আশংকা দেখা দিয়েছে।

কারণ হিসেবে জানা গেছে, আরইবি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মকর্তা-কর্মচারীদেও সম্প্রতি স্ট্যান্ড রিলিজ, ওএসডি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শাস্তিমূলক বদলি অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পবিস এর কর্মকর্তা কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগ করা হয়েছে। এ সুযোগটা নিতে পারে পবিস কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

সূত্র জানায়, আগামী মার্চ থেকে দেশে গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুম শুরু হচ্ছে। ২ বা ৩ মার্চে শুরু হচ্ছে পবিত্র রমযান। গরম মৌসুমে দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা দাঁড়াবে। কখনো কখনো তা ১৮ হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যাবে। জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে ১১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে। ফলে শীতের মধ্যেই গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দৈনিক এক থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের সংবাদ পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত যে প্রচেষ্টা তাতে আগামী গরমে দৈনিক গড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ লোডশেডিং পরিস্থিতি তীব্রতর হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার দেনায় ডুবেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু দেশের বাজারে বিদ্যুৎ-গ্যাস বিক্রি করে পিডিবির বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য টাকা এবং মার্কিন ডলার আগামী দুই বছরেও সংস্থান করা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রয়োজন সরকারের ভর্তুকি। গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুতে ১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি অনুমোদন করেছে। তবে সামগ্রিক প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

রমযানে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে একাধিক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রীষ্ম ও রমযানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে কিনা, সেটা নিয়ে তারাও উদ্বেগের মধ্যে আছেন। অনেকে বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে সরবরাহ পরিকল্পনা তৈরি করে। এখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের সরবরাহ না পেলে লোডশেডিং না দিয়ে উপায় নেই।

পিডিবি সূত্রে জানা যায়, আগামী মার্চ-এপ্রিলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ১৮ হাজার ২৩২ মেগাওয়াট। এই চাহিদা মেটাতে গ্যাসিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৬,৪০০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে ৫,৫৫৮ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪,১৪৯ মেগাওয়াট এবং ২,১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা প্রয়োজন হতে পারে।

এদিকে রমযানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানামুখী উদ্যোগের নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি অফিসে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে সাশ্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নানা বিষয়ে মাঠ প্রশাসনকে অবহিত করতে বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে সচিব এ বৈঠক করেন।

বৈঠকে বলা হয়- সরকারি দপ্তরে সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের নিয়মিত বৈঠকে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, অন্তত যাতে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়। অপচয়রোধে বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত, পেট্রল পাম্প ও সিএনজি গ্যাস স্টেশন, শপিংমল, মার্কেট, বিপণিবিতান, মডেল মসজিদসহ অন্যান্য উপাসনালয়ে দিনের বেলায় সূর্যের আলোর ব্যবহার বাড়াতে বলা হয়েছে। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি বা তার উপরে রেখে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে উদ্বুদ্ধ করতে লিফলেট বিতরণের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা বা কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে বলা হয়েছে।

নজর বাড়াতে হবে পবিসে

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) এর মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে গঠিত জাতীয় কমিটির কাজ চলমান থাকায় পবিসের পক্ষ থেকে সকল ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা সত্ত্বেও কর্মপরিবেশ স্থিতিশীল না করে আরইবি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্ট্যান্ড রিলিজ, ওএসডি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শাস্তিমূলক বদলি অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে বিদ্যুত সরবরাহ নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যাতে না পোহাতে হয় সে জন্য নজর বাড়াতে হবে । কারণ পরিকল্পিত লোডশেডিং দিয়ে যাতে গ্রাম গঞ্জে ভোগান্তি না বাড়তে পারে সেদিক নজর দিতে হবে।

পবিস এর কর্মকর্তা কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে হামলা, মামলা, চাকরিচ্যুতি, স্ট্যান্ড রিলিজ, ওএসডি অব্যাহত রাখার পর ১৫ই ডিসেম্বর, ২০২৪ থেকে ৫ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিজ জেলা থেকে গড়ে ৫০০-৬০০ কিলোমিটার মিটার দূরে বদলি করা হয়েছে। গত ২১শে জানুয়ারি ভোলা পবিসে আরইবি চেয়ারম্যান এর সাথে উন্মুক্ত মতবিনিময় সভার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের কারণে ২৭শে জানুয়ারি দুই জন এবং ফেসবুক কমেন্ট, শেয়ারের জন্য ২৮শে জানুয়ারি পটুয়াখালী পবিসের এক জন মিটার রিডারকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

বেসরকারি উদ্যোক্তরা বলছেন, বিল না পাওয়ায় উদ্যোক্তরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল কিনতে পারছে না। আর ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন সর্বনিম্ন ৪০ দিন সময় প্রয়োজন হয়। এখন বিল পাওয়া না গেলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব হবে না। ফলে আগামী গ্রীষ্মে ঘাটতি হতে পারে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, সরকারের কাছে বকেয়া প্রায় নয় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা শোধ করতে অনুরোধ হয়েছে। সরকার এ টাকাটা পরিশোধ করলে তেল আমদানি করে মার্চ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরকারকে সহায়তা করা যাবে। না হলে সম্ভব হবে না।

বিদ্যুৎ উন্নযন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, আসন্ন গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং কমাতে আমরা চেষ্টা করছি। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে বকেয়া বিল কিছু কিছু পরিশোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জ্বালানির জোগানের নিশ্চয়তা থাকলে আশা করি আসন্ন গ্রীষ্মে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বিদ্যুৎ থাকলেও জ্বালানির সংস্থান নেই। তাই সমস্যা তৈরি হয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানোর শর্টকাট সমাধান নেই। তাই অনেকগুলো গ্যাসকূপ সংস্কার করে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। তবে তা পর্যাপ্ত হবে না। এজন্য আমদানি বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু সেজন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ মার্কিন ডলারের সংস্থান নেই।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। তাই সম্ভবপর সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়ার এবং ডলার সংস্থানের চেষ্টা করছে সরকার। এখন যত বেশি সম্ভব কয়লা ও এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুত কন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধির চিন্তা করা হচ্ছে। এরপর পরিস্থিতি বুঝে জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানো হবে।