মুহাম্মদ নূরে আলম: শহীদ ওয়াসিম আকরাম কক্সবাজার জেলার পেকুয়ার মেহেরনামা বাজার পাড়া ৯নং ওয়ার্ড এলাকার শফিউল আলমের ছেলে। তার বাবা ও বড় ভাই আশরাপ আলী সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই ২০২৪) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মুরাদপুরের শিক্ষা বোর্ডের সামনে পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে বুলেট-ছুরিকাঘাতে আহত হন ওয়াসিম। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বুধবার (৯ অক্টোবর ২০২৪) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফলাফল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ওয়াসিম প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। সেই ফলাফল ফেসবুকে দিয়ে তার বন্ধু জাহেদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘আজ ওয়াসিমের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে পাস করেছে সে। কিন্তু রেজাল্ট শোনার আগেই ঘাতকের বুলেট তার জীবন প্রদীপ কেড়ে নিয়েছে।’ ভাইয়ের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবদুল্লাহ আল নোমান। বিলাপ করতে করতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘ছাত্রলীগ আমার ভাইকে ছুরি দিয়ে মেরে ফেললো। ভাই আমি মাকে কী জবাব দেবো? তুমি চোখ খুলো ভাই।’ আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওয়াসিম আকরাম ভাইকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।
এদিকে মঙ্গলবার (১৬ জুলাই ২০২৪) চট্টগ্রামে কোটা আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ওয়াসিমসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যরা হলেন, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও ফারুক। এর মধ্যে ফয়সাল আহমেদ শান্ত নগরের এমইএস কলেজের ছাত্র। পথচারী ফারুকের বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি ফার্নিচারের দোকানে চাকরি করতেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতালে আনা তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুজনের অবস্থা গুরুতর।
নতুন প্রজন্মের কিংবদন্তী: ১৪ ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে ওয়াসিম আকরাম লিখেছেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আমার প্রাণের সংগঠন। আমি এ পরিচয়ে শহীদ হবো।’ ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকে বলেন, কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলেন ওয়াসিম। তারা বিকেল চারটার দিকে নগরীর মুরাদপুরের শিক্ষাবোর্ডের সামনে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। দুপক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা, মো. ওয়াসিম আকরাম কক্সবাজার জেলার পেকুয়ার মেহেরনামা বাজার পাড়া ৯নং ওয়ার্ড এলাকার শফিউল আলমের ছেলে। তার বাবা ও ওয়াসিমের বড় ভাই আশরাপ আলী সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী। চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ওয়াসিম কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে শহীদ ওয়াসিমের, প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় নিহত শহীদ ওয়াসিম আকরামের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা হয়েছে আজ। অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ওয়াসিমের সেই ফলাফল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে ওয়াসিমকে স্মরণ করছেন তার সহপাঠি ও বন্ধুরা। শহীদ ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ওয়াসিমের সহপাঠি ইমরান হোসেন ও তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন ওয়াসিম। তিনি নগরীর প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। আন্দোলন ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠলেও দমে যাননি স্বৈরাচারবিরোধী অকুতোভয় এ বীর সেনানী। বরং অন্য সহযোদ্ধাদের মতোই আরো বেশি সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মধ্য জুলাইয়ে পরিস্থিতি মারমুখী হয়ে ওঠে। আমরা জানতে পারি, ১৬ জুলাই ২০২৪ দুপুর থেকে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। দুই নম্বর গেট এলাকায় একটি বাস ভাঙচুর করে তারা। বিকেল ৩টা থেকে নগরীর মুরাদপুর, ২ নং গেট ও ষোলশহরের আশপাশের এলাকায় কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের শুরুতে লাঠিপেটা করা হলেও, পরে গুলীবর্ষণ করে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সাথে সাদা পোশাকের কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গুলী ছুঁড়তে দেখা যায়। বেশ কিছু ককটেলও বিস্ফোরিত হয়। আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করে। পরে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এভাবে অনেক্ষণ চলতে থাকে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অনেকে অলিগলিতে ঢুকে পড়লে সেখানেও খুঁজে বের করে হামলা করা হয়। তার সহপাঠীরা বলেন, মৃত্যুর আগের দিন ওয়াসিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেয়। পোস্টটিতে সে লিখেছিল, “সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে আমার প্রাণের সংগঠন। আমি এ পরিচয়েই শহীদ হবো।” এর ঠিক ১৬ ঘণ্টা পরই শহীদ হলেন ওয়াসিম আকরাম। চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মী। কক্সবাজার জেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার এলাকার প্রবাসী শফিউল আলমের মেঝ ছেলে।
ওয়াসিমের বাবা প্রবাসী, মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। পিতামাতার ৫ সন্তানের মাঝে ওয়াসিম দ্বিতীয়। সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বড় ভাই মহিউদ্দিন চাকরি করেন। ছোট আরো এক ভাই ও দুই বোন পড়াশোনা করে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পরিবারের পক্ষে কথা বলেন ওয়াসিমের চাচা মাওলানা জয়নাল আবেদীন। আবেগাপ্লুত চাচা জয়নাল জানান, ‘ওয়াসিম কোটা সংস্কার আন্দোলনে গিয়ে এভাবে হারিয়ে যাবে কেউ কল্পনাও করেনি। তাকে হারিয়ে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে আমাদের পরিবারের ওপর। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমাদের। সে স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যায় ১৬ জুলাই বিকেলের একটি বুলেটে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে চাচা মাওলানা জয়নাল জানান, ‘আমার ইমামতিতে ১৭ জুলাই সকালে ১১টার দিকে ওয়াসিমের জানাযা হয়। এরপরই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।’ এলাকাবাসী জানায়, ওয়াসিমের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। চট্টগ্রাম শহরে পড়াশোনার ফাঁকে গ্রামে যেতেন ওয়াসিম। বিনয়ী হওয়ার কারণে সবাই তাকে পছন্দ করতেন। তিনিও সবার সাথে আন্তরিকভাবে মিশতেন। ওয়াসিমের পরিবারকে সরকার সর্বোতভাবে সাহায্য করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্থানীয়রা। ওয়াসিমের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি জানান পরিবার সদস্যরা।
শহীদ ওয়াসিম আকরামের নামে চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের নামে নগরের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন । শুক্রবার (৩ জানুয়ারি ২০২৫) সকাল ১০টায় এক্সপ্রেসওয়ের পতেঙ্গা প্রান্তে টোল আদায়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। তার সম্মানে এই নামকরণ করা হয়েছে। ১৬ জুলাই আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। সন্ত্রাসীদের গুলীতে মুরাদপুরে সেদিন তিন তিনটি প্রাণ ঝরে পড়ে। স্বৈরাচার হাসিনার দোসর ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলীতে ওইদিন শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ওয়াসিম আকরাম।’
চাকরি পেলেন শহীদ ওয়াসিম আকরামের ছোটবোন রোশনী: চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলীতে নিহত শহীদ ওয়াসিম আকরামের ছোটবোন রোশনী আক্তারকে চাকরি দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বুধবার (৫ ডিসেম্বর ২০২৪) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক সারোয়ার কামাল টারজেন নিয়োগপত্র তুলে দেন রোশনীর হাতে। এসময় শহীদ ওয়াসিমের বড় ভাই আসাদ ও অন্য স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। নিয়োগপত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন (এসভিআরএস) -এর ‘স্থানীয় নারী রেজিস্ট্রার’ পদে নিয়োগ দিয়েছেন তাকে। শহীদ ওয়াসিম আকরামের স্বজনরা বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ হয়েছেন সে। এই আত্মদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এদিকে শহীদ ওয়াসিমের পিতা শফিউল আলম বলেন, আমি প্রথমে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া এবং কক্সবাজারের সন্তান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি আমার পরিবারের প্রতি সুদৃষ্টি রেখেছেন বলে আমার মেয়ের চাকরি হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতেও তিনি আমার পরিবারের প্রতি সুদৃষ্টি রাখবেন। আমরা খুশি হয়েছি আমার মেয়ে চাকরি পাওয়ায়। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা যারা আমাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে তাদের কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজে শহীদ ওয়াসিমের মুরাল উন্মোচন: দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজে শহীদ ওয়াসিমের মুরাল উন্মোচন বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি ২০২৫) দুপুরে শহীদ ওয়াসিম আকরামের মুরাল উন্মোচন করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। তার স্মরণে ঢাকার মিরপুরের দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজের মূল ফটকের পাশে মুরাল নির্মিত হয়েছে।
কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। দেশের গণঅভ্যুত্থানে তার আত্মদানের প্রতি সম্মান জানাতে এই মুরাল উন্মোচন করা হয়েছে। এই উদ্যোগে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সভাপতি রবিন খান, সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল হোসেন সোহেল, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া খান সিজার সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। শহীদ ওয়াসিম আকরামের মুরাল উন্মোচনের সময় কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দুয়ারীপাড়া কলেজ ছাত্রদলের শেখ সানবিন মাহমুদ, কাজী লিমনসহ অনেকেই। আরও উপস্থিত ছিলেন রূপনগর থানা ছাত্রদলের ফয়সাল আহম্মেদ বাবু মিজি, সাব্বির রহমান সম্রাট, তৌওফ মোস্তফা ও মিরাজ খানসহ অনেকেই।