আজ ৩০ চৈত্র রোববার বাংলা বছরের শেষ মাসের শেষ দিন। দিনটি বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে চৈত্রসংক্রান্তি নামে। এ দিনে শুরু হয় হিসাবের ‘হালখাতা’ হালনাগাদের কাজ। শুরু নতুন বছরের হিসাব নিকাশের পালা। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ বাঙালীর শতবছরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অমোচনীয় লালিত ঐতিহ্য ও ইতিহাস। পরদিন সোমবার ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথম দিন।
চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সমতল ও পাহাড়ে বড় পরিসরে উৎসব উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে। যা নিজের ফেসবুকে শেয়ার দিয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন কোথায় এবার কী অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ ১৪৩২ উপলক্ষ্যে পাহাড় ও সমতলের সকল জাতিগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে বড় আকারে উৎসব উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এদিকে ফারুকী তার পোস্টে লিখেছেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ। নতুন বাংলাদেশ কেবল কথা বলে না, অবশ্যই এগিয়ে যায়।’ ফারুকীর দেওয়া সেই পোস্টে আরও জানানো হয়েছে- কোথায় কোথায় এবার চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে কী আয়োজিত হতে যাচ্ছে। আর এ উপলক্ষে কী কী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। ৪ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল: বিজু, বিসু, সাংগ্রাই, বিহু, বাহা, ওয়ানগালাসহ ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্থানীয় পর্যায়ে নববর্ষ উৎসব ও মেলা। ১২ এপ্রিল ছিল দেশব্যাপী ১২টি অঞ্চলে সাধুমেলা আয়োজন। একই দিনে শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের অংশগ্রহণে ফাগুয়া উৎসব। ১৩-১৪ এপ্রিল: নবপ্রাণ আন্দোলনের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠান। ১৩ এপ্রিল বিকেল ৩টা: ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ব্যান্ডশো। পারফর্ম করবেন এফ মাইনর (গারো ব্যান্ড), ইনভোকেশন (চাকমা ব্যান্ড), ইমাং (ত্রিপুরা ব্যান্ড), চিম্বুক (মারমা ব্যান্ড), ইউনিটি (খাসিয়া ব্যান্ড), এবং ওয়ারফেজ, দলছুট, এভোয়েড রাফা, লালন, ভাইকিংস, স্টন ফ্রি-সহ আরও অনেকে।
ব্যবসায়ীদের কাছে এ দুটি দিনের তাৎপর্য অপরিসীম। তারা চৈত্র সংক্রান্তিতে বিদায়ী বছরের হিসেবের লেনদেনের ইতি টানে। কেউ টানে ইজা। অর্থাৎ হিসাবের ‘হালনাগাদ’ থেকে ‘হালখাতা’। শত বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবসায়ীদের কাছে ‘হালখাতা’ একটি পবিত্র খতিয়ান। সারা বছরের লাভ লোকসান, দেনা পাওনা, জমা খরচের খতিয়ান। এখান থেকে শুরু নতুন বছরের। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান। বাঙালির ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ‘হালখাতা। সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব পালনে আড়ম্বরতায় ভাটা পড়লেও তা আপন ঐতিহ্যে এখনো টিকে আছে স্বমহিমায়। কেননা ‘হালখাতা’ যে বাঙালি বনেদি ব্যবসায়ীদের শেকড়ের সঙ্গে গাঁথা।
সাধারণভাবে ‘হালখাতা’ হলো নববর্ষে নতুন হিসাব লেখার খাতা। নতুন খাতাটি সাধারণত লালসালুতে মোড়ানো থাকে। হালখাতা হলো বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা। এ দিনটিতে ব্যবসায়ীরা তাঁদের পুরোনো হিসাব হালনাগাদ করে নতুন হিসাব শুরু করেন। এ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান। হালখাতা মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রথা হলেও কালের পরিক্রমায় এটি একটি সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ দিনটিতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়। চৈত্র মাসের শেষদিনে হিসাব নিকাশ শেষ করে প্রতিটি পরিবারে ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা নতুন জামা পরে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে।
শতবছরের বাঙালী সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’ হলেও ইদানীং সেই তাতে বাধ সেধেছে প্রযুক্তি। আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই সময়ে বিভিন্ন অ্যাপস ও অনলাইন শপিংয়ের কারণে হালখাতার সেই আগেকার দিনের জৌলুস কমে এসেছে। ব্যাংক, বীমা কর্পোরেট অফিসগুলো বড় বড় বালাম খাতার পরিবর্তে কম্পিউটার নির্ভর হয়ে গেছে।
১৫৫৬ সালে মোগল সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণের পর প্রদেশের খাজনা আদায়ের দিন-তারিখের একটি অভিন্ন সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেন। চান্দ্র বছরের গণনানুযায়ী, সৌর বছরের সঙ্গে দিনের পার্থক্য অনেক। ফলে চান্দ্র বছরের রীতি অনুযায়ী বছরের রাজস্ব আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট দিন ধার্য করা সম্ভব ছিল না। সে সময়ে ফসলে রাজস্ব আদায় করা হতো। কোনো কোনো বছর ফসল তোলার আগেই খাজনা দেওয়ার দিনটি এসে যেত। এতে করে প্রজারা খাজনা দিতে অসুবিধার সম্মুখীন হতো। সম্রাট আকবর প্রজাসাধারণের এই অসুবিধা দূর করার জন্য নতুন সন প্রবর্তনের চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ১৫৫৬ সালে সম্রাট আকবরের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের সময় হিজরি সন ছিল ৯৬৩। আর এ বছর থেকেই তিনি হিজরি সনকেই সৌর সনে পরিবর্তিত করে বাংলা সন চালু করেন।
প্রথমে এই সালের নাম রাখা হয়েছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ হিসেবে পরিচিতি পায়। এরপর চৈত্র মাসের শেষদিনে (চৈত্র সংক্রান্তি) জমিদারি সেরেস্তারা প্রজাদের কাছ থেকে কৃষি ও রাজস্ব কর বা খাজনা আদায় করতেন। এ সময় প্রতি চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল বা কর পরিশোধ করা হতো। এর পরেরদিন পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকেরা নিজেদের অঞ্চলের প্রজা বা অধিবাসীদের মিষ্টি, মিষ্টান্ন, পান-সুপারি প্রভৃতি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এটিই কালের পরিক্রমায় ‘হালখাতা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তখন বাঙালী মুসলমানরা খাতার প্রথম পাতায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বা ‘এলাহি ভরসা’ লিখতেন।
ডিজিটাল যুগে ভাটা পড়েছে ঐতিহ্যের হালখাতায়। চারপাশে প্রযুক্তির ছোঁয়া, কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর অ্যাপসের দুনিয়ায় হাতে লেখা খাতার প্রচলন প্রায় উঠে যেতে বসেছে। ফলে এখন আর বাংলা সনের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীদের নতুন হালখাতা খুলতে খুব একটা দেখা যায় না। তবে ঐতিহ্য রক্ষায় এখনো রাজধানীর অনেক ব্যবসায়ী রীতি ধরে রাখতে হালখাতা উৎসব করে থাকেন। এই হালখাতার উৎসব হয় মূলত, বৈশাখ মাসের প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে। এদিন ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে পুরোনো বছরের লেনদেন চুকিয়ে, নতুন বছরে খোলা হয় হিসাবের নতুন খাতা। শুরু হয় হালখাতা’র হালনাগাদ।