* ‘ধৈর্য ধরুন’ ভারত-পাকিস্তানকে গুতেরেস
* সর্বদলীয় বৈঠকে কাশ্মীর ইস্যুতে গোয়েন্দা ব্যর্থতা মানল মোদি সরকার
কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে নিহতের ঘটনায় চলমান উত্তেজনায় ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে গুলীবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বরাবর বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান গুলী চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ভারত। এ গুলীর জবাবে পাল্টা গুলী ছুঁড়েছে ভারতীয় সেনারা। কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এছাড়াও কাশ্মীর ইস্যুতে গত বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) ভারতের সংসদ ভবনে সর্বদলীয় বৈঠকে পেহেলগাঁওকাণ্ড নিয়ে আলোচনা উঠলে এ ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা। এ খবর দিয়েছে দ্য হিন্দু। তবে গুলীবিনিময়ের এসব ঘটনায় কোনো হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লীর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র দুটির মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের ‘চিন্তিত’ হওয়া উচিত। এছাড়াও ভারতীয় কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে পর্যটকদের ওপর সশস্ত্র হামলার পর পাক-ভারত সম্পর্ক যুদ্ধের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় মিডিয়ার একতরফা প্রচারণায় পেহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের দায় চাপানো হয়েছে পাকিস্তানের ওপর। ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী এই প্রোপাগান্ডায় তাল মিলিয়েছে। সব আন্তর্জাতিক আইন-কানুন উপেক্ষা করে সিন্ধু নদের পানি চুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। পাকিস্তান এই পানি আগ্রাসনকে যুদ্ধের সামিল বলে ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতি খুব উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। উভয় কাশ্মীরের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) বরাবর ভারত-পাকিস্তানের সেনারা যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ভারত ও পাকিস্তান কি সম্ভাব্য আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি? এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে-আশঙ্কা প্রবল। ভারতের একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাকিস্তানও পাল্টা কড়া জবাব দিয়েছে। পাকিস্তানের আকাশসীমা ভারতীয় বিমানের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতীয়দের পাকিস্তান ছাড়ার সময় বেঁধে দিয়েছে।
একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়ন্ত্রণরেখার কয়েকটি স্থানে ছোট আকারে গুলীবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের দিক থেকে প্রথম গুলী ছোড়া হয়েছে। তাদের এ গুলীবর্ষণের উপযুক্ত জবাব দেয়া হয়েছে।’ গত মঙ্গলবার ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তত ২৬ পর্যটক নিহত হন। এই ঘটনার পর প্রতিবেশী দেশ দু’টির মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ উত্তেজনার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের ‘চিন্তিত’ হওয়া উচিত- প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ: ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লীর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র দুটির মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের ‘চিন্তিত’ হওয়া উচিত। বৃটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ।
এতে বলা হয়, খাজা আসিফ সতর্ক করে বলেছেন যে, ভারতের দখলে থাকা জম্মু ও কাশ্মীরে (আইওজেকে) প্রাণঘাতী গুলীবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তা ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে। মঙ্গলবার ভারত-অধিকৃত পেহেলগাঁওয়ে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় জড়িয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। একতরফাভাবে ওই হামলার পুরো দায় ইসলামাবাদের ওপর চাপিয়েছে দিল্লী। তবে ইসলামাবাদ ভারতের দাবি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে এবং একে ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছে।
কথিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মতো পদক্ষেপ নিতে গেলেও ভারতকে যথেষ্ট ঝুঁকিতে পড়তে হবে। প্রশ্ন হলো, ভারত পাকিস্তানের ওপর এমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল কেন? কেনইবা, ভারতীয় মিডিয়া একযোগে পাকিস্তানবিরোধী প্রচারণায় লাগল। এর সহজ উত্তর হচ্ছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন টলটলায়মান। নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে। ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধেও মোদি সরকার বৈরি আচরণ করছে। ওয়াকফ আইন নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপে সেখানকার জনসাধারণ মোদি সরকারের বিরুদ্ধে চরমভাবে ক্ষুব্ধ।
‘ধৈর্য ধরুন’ ভারত-পাকিস্তানকে গুতেরেস: কাশ্মীরের পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি দুই প্রতিবেশী দেশকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে করে এই উত্তেজনা আরও বাড়তে না পারে। স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) মধ্যরাতে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্তা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। তিনি বলেন, পরিস্থিতির ওপর জাতিসংঘ নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে ওঠা এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে মহাসচিব অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
ডুজারিক জানান, ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পাল্টা পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই পটভূমিতে জাতিসংঘ মহাসচিব দুই দেশকে ‘সর্বোচ্চ ধৈর্য’ অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনো সমস্যা অর্থপূর্ণ আলোচনা এবং পারস্পরিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি, সেটিই হওয়া উচিত।’ তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সামাল দিতে শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক পথ অনুসরণের আহ্বান জানান।
সর্বদলীয় বৈঠকে কাশ্মীর ইস্যুতে গোয়েন্দা ব্যর্থতা মানল মোদি সরকার: কাশ্মীর ইস্যুতে বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) ভারতের সংসদ ভবনে সর্বদলীয় বৈঠকে পেহেলগাঁওকাণ্ড নিয়ে আলোচনা উঠলে এ ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা ও মোদি সরকার। বৈঠকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- এর নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন দেশটির সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। সেখানে বিরোধীরা সবাই সমস্বরে জানান, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কেন্দ্র সরকার যা পদক্ষেপ নেবে, তাতে পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বিরোধীদের।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, যদি ভুল না হয়ে থাকে, তা হলে আমরা এখানে বসে আছি কেন? কোথাও না কোথাও ব্যর্থতা রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। বৈঠক শেষে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, আমরা চাই যত তাড়াতাড়ি কাশ্মীরে শান্তি ফিরে আসুক। রাহুল গান্ধী শিগগিরিই কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় যাবেন, যেখানে আহতদের চিকিৎসা চলছে। এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনসিপি (শারদ পাওয়ার গোষ্ঠী) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে, এনসিপি সাংসদ প্রফুল্ল প্যাটেল, এআইএমআইএম সংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি, বিজু জনতা দল সাংসদ সুস্মিত পাত্র, তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) সাংসদ শ্রী কৃষ্ণা দেবারালু, তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবসেনা সংসদ সদস্য শ্রীকান্ত শিন্ডে, আপ সংসদ সঞ্জয় সিং, ডিএমকে সংসদ টি শিবা, রাষ্ট্রীয় জনতা দল সংসদ প্রেমচাঁদ গুপ্তা, সমাজবাদী পার্টির সংসদ রামগোপাল যাদব। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় সর্বদলীয় বৈঠকে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ কর্তাদের সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতাদের পেহেলগাঁও ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। সেখানে লোকসভার বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, সব রাজনৈতিক দল একযোগে এই বর্বর হামলার নিন্দা করেছি এবং সরকারকে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রাহুল বলেছিলেন, যা অ্যাকশন নেয়ার নিন। পুরো সাপোর্ট করব।