# আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে

# গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে

# ইসরাইলের সাথে সকল সম্পর্ক অবিলম্বে ছিন্ন করতে হবে

# পাসপোর্টে Except Israel শর্ত পুনর্বহাল করতে হবে

# ইসরাইল সমর্থিত সকল কোম্পানির পণ্য বর্জনের অঙ্গীকার

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলায় হাজার হাজার মুসলিম নর-নারী ও শিশু হত্যার নজীরবিহীন প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেশের সকল দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জনসমুদ্র থেকে ইসরাইলের গণহত্যা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরাইলের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ইসরাইলের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে যেসব কোম্পানী সহযোগিতা করছে তাদের পণ্য বর্জন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনের পতাকা উচিয়ে তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশের সর্বস্তরের লাখো লাখো মানুষ।

গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট, বাংলাদেশ’ নামক সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচীর ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। অরাজনৈতিক সংগঠনের আয়োজনে এ কর্মসূচীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ দেশের সর্বস্তরের রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে মঞ্চে উপস্থিত থেকে প্রত্যেকে ফিলিস্তিনের পতাকা উচিয়ে কর্মসূচীতে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং গণহত্যার প্রতিবাদ জানান।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে নানা সময় আন্দোলন হয়েছে এদেশে। তবে গতকাল শনিবার ‘মার্চ ফর গাজা’ শিরোনামে যে কর্মসূচি পালিত হলো এর কোনো নজির নেই বাংলাদেশে। একসঙ্গে প্রায় সব রাজনৈতিক দল, সব মত-পথ ও আদর্শের মানুষ এক মঞ্চে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে- এমন ঘটনা স্মরণ করতে পারছে না কেউই। এছাড়া এত বিপুলসংখ্যক মানুষ এভাবে একসঙ্গে প্রতিবাদও জানায়নি। এজন্য গতকালের এই কর্মসূচিকে নজিরবিহীন বলছেন অনেকেই।

‘প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট বাংলাদেশ’ নামে যে ব্যানারে এ আয়োজনটি করা হয়, এটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যানার। এর পেছনে বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিত্ব থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো নেতৃত্ব নেই। অথচ নতুন এই সংগঠনের ডাকেই দেশবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দিলো ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে। এর আগে গত ৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ডাক দেওয়া ‘নো ওয়ার্ক, নো স্কুল’ কর্মসূচিতেও দেশের মানুষ ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল।

‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণজমায়েতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল সবার। কিন্তু সকাল থেকেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বেলা যত বাড়তে থাকে ততই মানুষের স্রোতও ভারী হয়। দুপুর দুইটার আগেই কানায় কানায় ভরে যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, আশপাশের পুরো এলাকা ছিল মানুষে ঠাসা। একসঙ্গে এত মানুষের সম্মিলন খুব কমই দেখেছে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এমনকি কর্মসূচি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দলে দলে লোকজন সোহরাওয়ার্দীতে আসতে থাকে।

বিশাল এই কর্মসূচির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক ছিল, এখানে কাউকে বিশেষভাবে ফোকাস করা হয়নি। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব ইসলামী দল এবং সমমনা নেতারা কর্মসূচিতে যোগ দেন। তাদের অনেককে অতিথি হিসেবে মঞ্চে ডেকেও নেওয়া হয়। তবে কেউই বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি। এজন্য বক্তব্যের বাগাড়ম্বরও শুনতে হয়নি উপস্থিত শ্রোতাদের।

আহমেদ বিন ইউসুফে কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশিষ্ট দাঈ শায়খ আহমাদুল্লাহ এবং প্রখ্যাত ইসলামি আলোচক মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী উপস্থিত লাখো জনতাকে শান্ত করতে কিছু আহ্বানমূলক কথা বলেন। এছাড়া আয়োজকদের কেউই বক্তব্য দেননি। অনুষ্ঠানের ঘোষণাপত্র ও অঙ্গীকারনামা পাঠ করেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। পরে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত ঘোষণা করেন। সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার আনুষ্ঠানিকতা। মোনাজাতে মানুষ ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করেন।

সমাবেশে নানা ধরনের স্লোগান দেয়া হয়। এর মধ্যে এর মধ্যে ‘ফ্রি ফ্রি ফিলিস্তিন’ ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, জেনোসাইড নো মোর”। এ ছাড়াও মিছিলে মিছিলে, স্লোগানে স্লোগানে গণজমায়েত স্থলে এসে জড়ো হন লোকজন। তাদের অনেকেই ফিলিস্তিনের পতাকা, মাফলার, টি-শার্ট, মাথার ব্যান্ডসহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে এখানে এসে জড়ো হতে দেখা যায়। সমাবেশে আগত মিছিল থেকে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’, ‘ইসরাইলী পণ্য, বয়কট বয়কট’, ‘ফিলিস্তিন ফিলিস্তিন, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ,’ ‘নেতানিয়াহুর চামড়া, তুলে নিবো আমরা’, ‘নেতানিয়াহুর দুইগালে, জুতা মারো তালে তালে,’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

ঘোষণাপত্র ও অঙ্গীকারনামা

গতকাল শনিবার (১২ এপ্রিল) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মার্চ ফর গাজা গণজমায়েত থেকে এ ঘোষণাপত্র পাঠ করেন আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

ঘোষণাপত্র ও অঙ্গীকারনামা হলো : আল্লাহর নামে শুরু করছি যিনি পরাক্রমশালী, যিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী, যিনি মজলুমের পাশে থাকেন, আর জালেমের পরিণতি নির্ধারণ করেন।

আজ আমরা, বাংলাদেশের জনতা-যারা জুলুমের ইতিহাস জানি, প্রতিবাদের চেতনা ধারণ করি-সমবেত হয়েছি গাজার মৃত্যুভয়হীন জনগণের পাশে দাঁড়াতে। আজকের এই সমাবেশ কেবল প্রতিবাদ নয়, এটি ইতিহাসের সামনে দেয়া আমাদের জবাব, একটি অঙ্গীকার, একটি শপথ।

এই পদযাত্রা ও গণজমায়েত থেকে আজ আমরা চারটি স্তরে আমাদের দাবিসমূহ উপস্থাপন করব-

আমাদের প্রথম দাবিগুলো জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি যেহেতু-জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সকল জাতির অধিকার রক্ষার, দখলদারিত্ব ও গণহত্যা রোধের সংকল্প প্রকাশ করে; এবং আমরা দেখেছি, গাজায় প্রতিদিন যে রক্তপাত, যে ধ্বংস চলছে, তা কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয় বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক ব্যর্থতার ঢল; এবং এই ব্যর্থতা শুধু নীরবতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং পশ্চিমা শক্তিবলয়ের অনেক রাষ্ট্র সরাসরি দখলদার ইসরাইলকে অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে এই গণহত্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে, এবং এই বিশ্বব্যবস্থা দখলদার ইসরাইলকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে বরং রক্ষা করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে;

সেহেতু আমরা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো দাবি জানাচ্ছি :

১। জায়নবাদী ইসরাইলের গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে নিশ্চিত করতে হবে, ২। যুদ্ধবিরতি নয়-গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; ৩। ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী ভূমি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে; ৪। পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে: ৫। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। কারণ-এই মুহূর্তে বিশ্বব্যবস্থা যে ন্যায়ের মুখোশ পরে আছে, গাজার ধ্বংসস্তূপে সেই মুখোশ খসে পড়েছে।

আমাদের দ্বিতীয় দাবিগুলো মুসলিম উম্মাহর নেতৃবৃন্দের প্রতি : যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি, ফিলিস্তিন কেবল একটি ভূখণ্ড নয়-এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয়ের অংশ; এবং গাজা এখন কেবল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর নয়-এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি; এবং উম্মাহর প্রতিটি সদস্য, প্রতিটি রাষ্ট্র, এবং প্রতিটি নেতৃত্বের উপর অর্পিত সেই আমানত-যা আল্লাহ প্রদত্ত ভ্রাতৃত্ব ও দায়িত্বের সূত্রে আবদ্ধ, এবং ইসরাইল একটি অবৈধ, দখলদার, গণহত্যাকারী রাষ্ট্র-যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা ও একটি পুরো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে; এবং ভারতের হিন্দুত্ববাদ আজ এই অঞ্চলে জায়নবাদী প্রকল্পের প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে-মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত দমন-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, এবং ভারতে সম্প্রতি ওয়াকফ সম্পত্তি আইনে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক অধিকার হরণ করা হয়েছে-যা উম্মাহর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা: সেহেতু আমরা মুসলিম বিশ্বের সরকার ও ওআইসি’র মতো মুসলিম উম্মাহর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর কাছে দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানাই: ১। ইসরাইলের সাথে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সকল সম্পর্ক অবিলম্বে ছিন্ন করতে হবে; ২। জায়নবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে; ৩। গাজার মজলুম জনগণের পাশে চিকিৎসা, খাদ্য, আবাসন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে; ৪। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরাইলকে এক ঘরে করতে সক্রিয় কূটনৈতিক অভিযান শুরু করতে হবে; ৫। জায়নবাদের দোসর ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসনের অধীনে মুসলিমদের অধিকার হরণ, বিশেষ করে ওয়াকফ আইনে হস্তক্ষেপের মতো রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ওআইসি ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে দৃঢ় প্রতিবাদ ও কার্যকর কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। কারণ- গাজার রক্ত প্রবাহে আমরা লজ্জিত হওয়ার আগেই, গাজার পাশে দাঁড়ানোই উম্মাহর জন্য সম্মানের একমাত্র পথ। এবং যে নেতৃত্ব আজ নীরব, কাল ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

আমাদের তৃতীয় দাবিগুলো বাংলাদেশ সরকারের প্রতি- যেহেতু-বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, যার স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তিতেই নিহিত রয়েছে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনা; এবং-আমরা বিশ্বাস করি, ফিলিস্তিনের প্রশ্নে বাংলাদেশ কেবল মানবতার নয়-ঈমানের পক্ষেও এক ঐতিহাসিক অবস্থানে আছে; এবং-একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব, জনগণের ঈমানি ও নৈতিক আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা; এবং-বাংলাদেশের জনগণ গাজার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে, তাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীরবতা এই জনআকাক্সক্ষার প্রতি অবজ্ঞার শামিল: সেহেতু আমরা বাংলাদেশের সরকারের প্রতি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানাই: ১। বাংলাদেশী পাসপোর্টে ‘ঊীপবঢ়ঃ ওংৎধবষ’ শর্ত পুনর্বহাল করতে হবে এবং ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থান আরও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে; ২। সরকারের ইসরাইলী কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যত চুক্তি হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে; ৩। রাষ্ট্রীয়ভাবে গাজায় ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে; ৪। সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং আমদানি নীতিতে জায়নবাদী কোম্পানির পণ্য বর্জনের নির্দেশনা দিতে হবে; ৫। জায়নবাদের দোসর ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে, যেহেতু হিন্দুত্ববাদ আজ শুধু একটি স্থানীয় মতবাদ নয়-বরং আন্তর্জাতিক জায়নিস্ট ব্লকের অন্যতম দোসর; ৬। পাঠ্যবই ও শিক্ষা নীতিতে আল-আকসা, ফিলিস্তিন এবং মুসলিমদের সংগ্রামী ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যৎ মুসলিম প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় নিয়ে গড়ে ওঠে। কারণ-রাষ্ট্র কেবল সীমানা নয়, রাষ্ট্র এক আমানত। আর এই আমানত রক্ষা করতে না পারলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না।

আমাদের সর্বশেষ দাবিগুলো নিজেদের প্রতি যা মূলত একটি অঙ্গীকারনামা: যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি, আল-কুদস কেবল একটি শহর নয়-এটি ঈমানের অংশ: এবং-আমরা জানি, বাইতুল মাকদিসের মুক্তি অন্য কারো হাতে নয়-আমাদেরই কোন প্রজন্মের হাতে তা লেখা হবে; এবং-আমরা বুঝি, জায়নবাদের প্রতিষ্ঠা মূলত আমাদের নিজেদের আত্মবিস্মৃতির ফল; এবং-আজ যদি আমরা প্রস্তুত না হই, তাহলে আল্লাহ না করুন কাল আমাদের সন্তানেরা হয়তো এমন এক বাংলাদেশ পাবে-যেখানে হিন্দুত্ববাদ ও জায়নবাদ একত্রে নতুন গাজা তৈরি করবে; এবং-গাজা আমাদের জন্য এক আয়না-যেখানে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে বিশ্বাসী হওয়া মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, সংগ্রামে দৃঢ় থাকা; সেহেতু আমরা এই মাটির মানুষ, এই মুসলিম ভূখণ্ডের নাগরিক, এই কওমের সন্তান এবং সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর সদস্য-একটি অঙ্গীকার করছি: ১। আমরা সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বয়কট করবো-প্রত্যেক সেই পণ্য, কোম্পানি ও শক্তিকে যারা ইসরাইলের দখলদারিত্বকে টিকিয়ে রাখে; ২। আমরা আমাদের সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করবো-যারা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সকল প্রতীক ও নিদর্শনকে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করবে, ইনশা আল্লাহ, ৩। আমরা আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলবো যারা নিজেদের আদর্শ ও ভূখণ্ড রক্ষায় জান ও মালের সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত থাকবে; ৪। আমরা বিভাজিত হবো না-কারণ আমরা জানি, বিভক্ত জনগণকে দখল করতে দেরি হয় না। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো, যাতে এই বাংলাদেশ কখনো কোনো হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের পরবর্তী গাজায় পরিণত না হয়। আমরা শুরু করবো নিজেদের ঘর থেকে ভাষা, ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজ-সবখানে এই অঙ্গীকারের ছাপ রেখে। আমরা মনে রাখবো: গাজার শহীদরা কেবল আমাদের দোয়া চান না-তারা আমাদের প্রস্তুতি চান।

শেষ কথা : শান্তি বর্ষিত হোক গাজার সম্মানিত অধিবাসীদের উপর- তাদের উপর, যারা নজিরবিহীন সবর করেছেন, যারা অবিচল ঈমানের প্রমাণ দিয়েছেন। যারা ধ্বংসস্তূপের মাঝেও প্রতিরোধের আগুন জ্বেলেছেন। বিশ্বের নীরবতা ও উদাসীনতার যন্ত্রণা হাসিমুখে বুকের মাঝে ধারণ করেছেন। শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর, যারা নাম রেখে গেছেন ইজ্জতের খতিয়ানে- শান্তি বর্ষিত হোক হিন্দ রজব, রীম এবং ফাদি আবু সালেহসহ সকল শহীদের উপর, যাদের রক্ত দ্বারা গাজার পবিত্র ভূমি আরো পবিত্র হয়েছে, যাদের চোখে ছিল প্রতিরোধের অগ্নিশিখা। শান্তি বর্ষিত হোক বাইতুল মাকদিসের গর্বিত অধিবাসীদের উপর, যাদের হৃদয়ে এখনো ধ্বনিত হয় ‘আল-কুদস লানা’, আল কুদস আমাদের! গাজার জনগণকে অভিনন্দন- আপনারা ঈমান, সবর আর কুরবানির মহাকাব্য রচনা করেছেন। দুনিয়াকে দেখিয়েছেন-ঈমান আর তাওয়াক্কুলের শক্তি। আমরা, বাংলাদেশের মানুষ-শাহ জালাল আর শরীয়াতুল্লাহর ভূমি থেকে দাঁড়িয়ে, আপনাদের সালাম জানাই, আপনাদের শহীদদের প্রতি ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানাই, আর আমাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এই দোয়া- হে আল্লাহ, গাজার এই সাহসী জনপদকে তুমি সেই পাথর বানিয়ে দাও, যার উপর গিয়ে ভেঙে পড়বে জায়োনিস্টদের সব ষড়যন্ত্র।

মঞ্চ থেকে আহ্বান

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে মার্চ ফর গাজা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে মঞ্চ থেকে নানা ধরনের ঘোষণা দেয়া হয়। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের সব দল, মত, চিন্তা-দর্শনের মানুষ মজলুম ফিলিস্তিন ও মজলুম গাজার পাশে আছে, সহাবস্থান করছে।

আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, ‘আমরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিতে চাই, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন চিন্তা, মতগত পার্থক্য, ভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু মজলুম ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতা, ভূমির অধিকারের দাবিতে আমরা প্রত্যেকটা বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকে তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছি।’

সমাবেশে ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী বলেছেন, ‘ভৌগোলিকভাবে আমরা ফিলিস্তিন থেকে অনেক দূরে হতে পারি, কিন্তু আজকের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে, আমাদের হৃদয়ে বাস করে একেকটা ফিলিস্তিন, আমাদের হৃদয়ে বাস করে একেকটা গাজা, আমাদের হৃদয়ে বাস করে একেকটা আল কুদস। এই জনসমুদ্র ফিলিস্তিনের প্রতি, আল আকসার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেন আজহারী। তিনি বলেন, ‘আজকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, এই গণ জমায়েতে, এই জনতার গণসমুদ্রে উপস্থিত হয়ে আমরা বুঝতে পেরেছি, আজকের এই মহাসমুদ্র, জনসমুদ্র ফিলিস্তিনের প্রতি, আল আকসার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’

মোনাজাতে কাঁদলেন লাখো মানুষ

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও শান্তি কামনায় ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে বিশেষ মোনাজাত করা হয়েছে। মোনাজাতে অংশ নেওয়া লাখো মানুষের চোখে ছিল অশ্রু। ইসরাইলী বাহিনীর অব্যাহত হামলা, শিশু ও নারীদের মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকার করুণ বাস্তবতা হৃদয়ে নিয়ে মানুষ প্রার্থনা করেন শান্তির জন্য।

মোনাজাতে বলা হয়, ইসরাইল ফিলিস্তিনে যে নৃশংসতা চালাচ্ছে, তা মানবতার ওপর চরম আঘাত। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, যেন তিনি নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষা করেন এবং ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতার আলো দেখান। একইসঙ্গে মোনাজাতে গাজায় চলমান ইসরাইলি হামলা বন্ধ হওয়া, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধার ও আহতদের সুস্থতা, শিশু ও নিরীহ নাগরিকদের জীবন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, বিশ্ব নেতাদের বিবেক জাগ্রত হওয়া, নিরস্ত্র ফিলিস্তিনীদের ওপর অব্যাহত আগ্রাসনের বিচার চেয়ে দোয়া করা হয়েছে।

সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন যারা

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুহাম্মাদ আবদুল মালেক। মুফতি রেজাউল করিম আবরারের উপস্থাপনায় কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মদ খলীলুর রহমান নেছারাবাদী পীর সাহেব হুজুর, বিএনপির পক্ষ থেকে অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, খেলাফত মজলিশের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আব্দুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানী, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ও দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন, জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, বিশিষ্ট ইসলামী আলোচক শাইখ আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ, ড. ফয়জুল্লাহ, নিরাপদ সড়ক চাই’র চেয়ারম্যান নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চান, মাওলানা হাসান জামিল, হেফাজতে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, মাওলানা ইমতিয়াজ আলম, প্রিন্সিপাল শেখ ফজলে বারী মাসউদ, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব ও জামিয়া রাহমানিয়ার পরিচালক মাওলানা মাহফুজুল হক, কবি মুহিব খান, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, জাগপার রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েমসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। এদিকে মার্চ ফর গাজা কর্মসূচির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

মার্চ ফর গাজায় অংশ নেয় যেসব রাজনৈতিক দল: ফিলিস্তিনের গাজায় নির্যাতিতদের জন্য ‘মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের সব এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। মূল অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও প্রতিনিধিরা এবং ইসলামি বক্তাসহ বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সারা বাংলাদেশ ও রাজধানীর আশপাশের এলাকা থেকেও এসে যোগ দেন মানুষ। আহ্বানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফিলিস্তিনের সমর্থনে সর্বকালের বৃহত্তম সমাবেশ হয়।